যুক্তরাজ্যের মধ্য ওয়েলসের স্যাঁতসেঁতে পাহাড়ি এলাকায় হামিশ উইলসনের একটি মনোরম খামারবাড়ি। কফির কাপে গল্প, অতিথি আপ্যায়ন আর মানবিক উষ্ণতার জন্য জায়গাটি পরিচিত। প্রতি গ্রীষ্মে কয়েক শ সোমালি পরিবার এখানে বেড়াতে আসে। এটি কোনো বাণিজ্যিক পর্যটন নয়, বরং সোমালি সংস্কৃতি উদ্যাপন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর পাশে লড়াই করা এক সোমালি যোদ্ধার স্মৃতিকে সম্মান জানানোর মানবিক উদ্যোগ।
এই আয়োজনের শিকড় গড়ে উঠেছে ১৯৪০ সালে।
তখন ২৭ বছর বয়সী ক্যাপ্টেন এরিক উইলসন ব্রিটিশ সোমালিল্যান্ডে ইতালীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অসম এক যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত অবস্থায়, অল্প কয়েকজন সোমালি সহযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পাঁচ দিন ধরে ভারী কামানের আক্রমণ প্রতিহত করেন। অবস্থান পতনের পর তাকে মৃত ধরে মরণোত্তর ভিক্টোরিয়া ক্রস দেওয়া হয়—ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ সম্মান।
কয়েক মাস পর যুদ্ধবন্দী শিবির থেকে জীবিত ফিরে আসেন এরিক উইলসন। কিন্তু সম্মান তাকে আনন্দ দেয়নি; বরং আজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে এক প্রশ্ন—তার সার্জেন্ট ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু সোমালি যোদ্ধা ওমর কুজুগের মতো মানুষরা কেন ইতিহাসে অদৃশ্য রয়ে গেলেন? এই অপরাধবোধ ও আফ্রিকাপ্রীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন তার ছেলে হামিশ উইলসন।
হামিশ নিজেও দীর্ঘ সময় পূর্ব আফ্রিকায় কাটিয়েছেন। তিনি লক্ষ করেন, যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা তরুণ সোমালিরা ধীরে ধীরে নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। গণমাধ্যমের নেতিবাচক উপস্থাপনায় তারা নিজেদের দেশ সম্পর্কে শুধু যুদ্ধ, দারিদ্র্য আর হতাশার গল্পই জানে। এই প্রেক্ষাপটেই ২০১০ সালে, এরিক উইলসনের মৃত্যুর আগে তার প্রাপ্ত ভিক্টোরিয়া ক্রস বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করা হয়।
সেই অর্থে কেনা খামারবাড়িতে গড়ে ওঠে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র—‘দেগমো’, সোমালি ভাষায় যার অর্থ যাযাবর পশুপালকদের তাবু। প্রতি গ্রীষ্মে পরিবারগুলো এখানে আসে। তারা তাবু খাটায়, বনভূমিতে হাঁটে, খোলা আকাশের নিচে তারা দেখে। বৃদ্ধারা নাতি-নাতনিদের ছাগলের দুধ দোহানো শেখান, শোনান নিজেদের জীবনের গল্প। খরচ চালাতে অতিথিরা উইলসনের চ্যারিটি ফান্ডে সামান্য অনুদান দেন।
সবকিছু স্বাভাবিক ছিল—যতক্ষণ না শুরু হয় ব্যাংকিং জটিলতা। উইলসনের ভাষায়, ব্যাংক প্রায়ই তার অ্যাকাউন্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলে, বারবার একই ব্যাখ্যা চায়, প্রতিবার আধা ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদ যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
তবে সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তার সোমালি অতিথিরা। বার্মিংহামের এক সোমালি নারী জানান, কয়েক ডজন মানুষের এই সফরের আয়োজন করতে গিয়ে তাকে কার্যত মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সবাই তার অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতেন, আর তিনি সেখান থেকে থাকা-খাওয়ার খরচ মেটাতেন। মাত্র তিন মাসে প্রায় চার হাজার পাউন্ড লেনদেনেই ব্যাংক তাকে তলব করে।
প্রতিটি লেনদেনের ব্যাখ্যা, টাকার উৎস, সম্পর্কের ধরন—সবকিছু জানতে চাওয়া হয়। সোমালিয়ায় বোনের কাছে বিমান টিকিটের টাকা পাঠালে সেটি আটকে দেওয়া হয়। বন্ধুদের সঙ্গে গড়া সঞ্চয় সমিতির অর্থও ফ্রিজ হয়ে যায়। এমনকি লেনদেনের নোটে ইংরেজির বদলে সোমালি ভাষা ব্যবহার করলেই ট্রান্সফার বন্ধ হয়ে যেত।
এই মানুষগুলো সবাই ব্রিটিশ নাগরিক। তবু তারা কেন ভিন্ন আচরণের শিকার? ওই নারী আক্ষেপ করে বলেন, বিষয়টি নাগরিকত্ব নয়—তিনি গরিব এবং মুসলিম, এই পরিচয়ই যথেষ্ট সন্দেহের জন্য।
বিশ্লেষকদের মতে, এর শিকড় ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর গড়ে ওঠা বৈশ্বিক সন্ত্রাস দমন কাঠামোতে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রণীত কঠোর নিয়মগুলো ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফএটিএফ) বিশ্বজুড়ে বাস্তবায়ন করে। ব্যাংকগুলোকে সন্দেহজনক লেনদেন দেখলেই সরকারকে জানাতে বাধ্য করা হয়—নইলে মোটা অঙ্কের জরিমানা।
সমস্যা হলো, মানি লন্ডারিং আর সন্ত্রাসী অর্থায়নের পার্থক্য নির্ধারণের দায়িত্ব কার্যত ব্যাংকের কাঁধে চাপানো হয়েছে। আইএমএফের আইনজীবী রিচার্ড গর্ডন একে শুরু থেকেই অবাস্তব বলে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু কেউ শোনেনি। ২০০৪ সালে আরব ব্যাংকের বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতের রায় ব্যাংকগুলোর ভয় আরও বাড়িয়ে দেয়।
২০০২ সালে এফএটিএফ ইঙ্গিত দেয়—বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য চ্যারিটির নামে অর্থ সংগ্রহ সন্দেহজনক হতে পারে। এর পর থেকেই মুসলিম পরিচালিত সংস্থাগুলোর অ্যাকাউন্ট বন্ধের প্রবণতা বাড়তে থাকে, যা পরিচিত হয় ‘ডিব্যাঙ্কিং’ নামে। ২০২২ সালের জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে ২৫ শতাংশের বেশি মুসলিম ব্যাংকিং সমস্যার শিকার হয়েছেন—শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় তিন গুণ।
যুক্তরাজ্যেও চিত্র ভিন্ন নয়। ২০১৪ সালে এইচএসবিসি কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই বহু মুসলিম সংগঠনের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়। আপিলের সুযোগও ছিল না। এর ফল হিসেবে দান বন্ধ হয়ে যায়, সামাজিক লজ্জা তৈরি হয়, আর একবার নাম উঠলে অন্য ব্যাংকও দূরে থাকে।
লন্ডন সোমালি ইয়ুথ ফোরামের পরিচালক মোহামেদ ইব্রাহিম প্রশ্ন তোলেন—‘নিরপরাধ মানুষকে সমাজচ্যুত করে কি সন্ত্রাসবাদ ঠেকানো যায়?’ তার মতে, এটি নিছক নিরাপত্তা নয়, বরং কাঠামোগত বৈষম্য।
ব্যাংকগুলো অবশ্য বর্ণবাদের অভিযোগ অস্বীকার করে। তারা ‘অ্যাডভার্স নিউজ’ সফটওয়্যার ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কথা বলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—জরিমানার ভয় ব্যাংকগুলোকে যাচাইয়ের চেয়ে অ্যাকাউন্ট বন্ধের পথেই ঠেলে দিচ্ছে। ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যে বছরে অ্যাকাউন্ট বন্ধের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৩ হাজারে।
ধনীদের ক্ষেত্রে নিয়ম শিথিল হয়। ক্ষমতাবানরা প্রতিবাদ করলে নীতি বদলায়। কিন্তু ওয়েলসের সেই খামারে আসা সোমালি বৃদ্ধা কিংবা বার্মিংহামের সেই নারী—তাদের কথা শোনার কেউ নেই। ব্যাংকগুলো আজ কার্যত পুলিশের ভূমিকা পালন করছে, আর সেই ক্ষমতার নিশানায় পড়ছে সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলোই।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

