যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এনএইচএস (ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস) হাসপাতালগুলোতে গত এক বছরে অন্তত ৪০৩টি গুরুতর চিকিৎসাগত ভুলের ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘নেভার ইভেন্টস’ বলা হয়—অর্থাৎ এমন ভুল যা কোনো পরিস্থিতিতেই ঘটার কথা নয়। সরকারি পরিসংখ্যানে প্রকাশিত এই তথ্য দেশজুড়ে স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো ১৬৬টি ক্ষেত্রে রোগীর শরীরের ভুল অংশে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। কিছু ঘটনায় ভুল হাত, পা বা অঙ্গে অপারেশন করার মতো গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়েছে। এমনকি একাধিক ক্ষেত্রে সুস্থ অঙ্গ কেটে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে, যা চিকিৎসা ব্যবস্থার মৌলিক নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার চরম ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ১২১ জন রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর তাদের শরীরের ভেতরে সার্জিক্যাল গ্লাভস, কাঁচি, সুই, গজ বা অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম ভুলবশত রেখে দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের ঘটনা সাধারণত ‘রিটেইনড সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টস’ নামে পরিচিত, যা মারাত্মক সংক্রমণ, অভ্যন্তরীণ জটিলতা এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এছাড়া কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ভুল রক্তের গ্রুপের রক্ত দেওয়া হয়েছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণঘাতী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ভুল সিরিঞ্জ বা মাত্রাতিরিক্ত ইনসুলিন প্রয়োগের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে, যা হাইপোগ্লাইসেমিয়া ও অচেতন অবস্থার মতো ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ‘নেভার ইভেন্টস’ সাধারণত সিস্টেমিক ত্রুটি, কর্মীর ঘাটতি, অতিরিক্ত চাপ এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবের কারণে ঘটে। এনএইচএস দীর্ঘদিন ধরেই রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির চাপ, চিকিৎসক ও নার্স সংকট এবং জরুরি সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপের মুখোমুখি রয়েছে।
ব্রিটিশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)-এর পূর্ববর্তী বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, কর্মঘণ্টার অতিরিক্ত চাপ এবং হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা চিকিৎসা ভুলের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত রোগী ভিড় এবং কর্মী ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সরকারি স্বাস্থ্য নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব ঘটনার পরিমাণ উদ্বেগজনক হলেও এনএইচএসে রোগী নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে নতুন নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম, অস্ত্রোপচারের আগে বাধ্যতামূলক চেকলিস্ট এবং সার্জিক্যাল টিমের জন্য অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।
তবে সমালোচকরা বলছেন, এসব পদক্ষেপ অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। তাদের মতে, প্রতিটি ‘নেভার ইভেন্ট’ আসলে একজন রোগীর জীবন, আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ক্ষতির প্রতীক। তাই শুধু পরিসংখ্যান প্রকাশ নয়, বাস্তব সংস্কার প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এ ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে যে রোগী সুরক্ষা ব্যবস্থায় এখনও গুরুতর ফাঁক রয়ে গেছে।
এনএইচএস কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে জনমনে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা হিসেবে পরিচিত এনএইচএসে কেন বারবার এমন মারাত্মক ভুল ঘটছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ৪০৩টি ‘নেভার ইভেন্টস’ শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; বরং এটি একটি বৃহৎ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চাপ, সীমাবদ্ধতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতার বাস্তব প্রতিচিত্র।
সূত্রঃ স্কাই নিউজ
এম.কে

