যুক্তরাজ্যের ইংল্যান্ডে নার্সের ঘাটতি রোগীদের নিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে বলে সতর্ক করেছে রয়্যাল কলেজ অব নার্সিং (আরসিএন)। সংগঠনটির নতুন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত নিবন্ধিত নার্স না থাকায় রোগীরা ব্যথানাশক ও জরুরি ওষুধ পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। একই সঙ্গে হাসপাতালের বিছানা থেকে পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙা ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের মতো ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
আরসিএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইংল্যান্ডের এনএইচএসে নিরাপদভাবে রোগীদের সেবা দিতে প্রয়োজনীয় নিবন্ধিত নার্সের প্রকৃত ঘাটতি প্রায় ৫৫ হাজার। এই সংখ্যা আগস্ট ২০২৬-এর সরকারি হিসাবে থাকা ২৩ হাজার ৪৬টি নার্সিং শূন্যপদের দ্বিগুণেরও বেশি। আরসিএনের দাবি, সরকারি শূন্যপদের হিসাব দিয়ে প্রকৃত ঘাটতির পুরো চিত্র বোঝা যায় না।
হাসপাতাল ট্রাস্টগুলোর বোর্ডের নথি বিশ্লেষণ করে আরসিএন জানিয়েছে, নার্সের স্বল্পতার সঙ্গে সম্পর্কিত রোগী নিরাপত্তা-সংক্রান্ত শত শত ঘটনা কিছু হাসপাতালে প্রতি মাসে নথিভুক্ত হচ্ছে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে ব্যথানাশক ওষুধ দিতে দেরি, প্রয়োজনীয় ওষুধে বিলম্ব, রোগীর নিয়মিত পরীক্ষা বা পরিচর্যা বাদ পড়া এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক নিবন্ধিত নার্স না থাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইংল্যান্ডের মিড অ্যান্ড সাউথ এসেক্স এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টে এক মাসে ৫৭৩টি ‘নার্সিং রেড ফ্ল্যাগ’ নথিভুক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে ২০৬টি ছিল নির্ধারিত পরিচর্যা বাদ পড়ার ঘটনা এবং ১৩৮টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক লক্ষণ নথিভুক্ত করতে বিলম্বের বিষয়ে সতর্কতা।
প্রিন্সেস আলেকজান্দ্রা হাসপাতাল এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টে জুন মাসে ১৫৯টি রেড ফ্ল্যাগ এবং ইউনিভার্সিটি হসপিটালস অব ডার্বি অ্যান্ড বার্টন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টে একই মাসে ১০০টির বেশি রেড ফ্ল্যাগের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউনিভার্সিটি হসপিটাল সাউদ্যাম্পটন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট জুলাই মাসে ১৯টি রেড ফ্ল্যাগের পাশাপাশি ১২৬টি কর্মী-সংক্রান্ত নিরাপত্তা ঘটনার রিপোর্ট করেছে; এর মধ্যে পাঁচটি ছিল মাঝারি বা গুরুতর মাত্রার ওষুধ-সংক্রান্ত ভুল।
আরসিএনের তথ্য অনুযায়ী, টরবে অ্যান্ড সাউথ ডেভন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টে জুলাই ২০২৬-এ সাতটি গুরুতর ক্ষতির ঘটনা রিপোর্ট হয়। এর মধ্যে দুটি ঘটনায় রোগীরা নজরদারি ছাড়াই পড়ে গিয়ে নিতম্বের হাড়ে চিড় বা ভাঙার শিকার হন। অন্যদিকে কিংস্টন হাসপাতাল এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টে ত্বকের ক্ষত, সহায়তা নিয়ে রোগীর পড়ে যাওয়ার ঘটনা এবং জরুরি বিভাগে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে দীর্ঘ সময় অবস্থানের ঘটনা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইস্ট অব ইংল্যান্ডের একটি হাসপাতালের এক নিবন্ধিত নার্স আরসিএনকে জানান, তাদের ইউনিটে একজন বয়স্ক রোগী বিছানা থেকে পড়ে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের শিকার হন। রাতে পর্যাপ্ত কর্মী না থাকায় অন্তত ১০ মিনিট পর্যন্ত তাকে সাহায্য করার মতো কেউ উপস্থিত ছিলেন না। পরে মস্তিষ্কের আঘাতের বিষয়টি নিয়ে বেশি উদ্বেগ থাকায় রোগীর নিতম্বের হাড়ও ভেঙেছিল—এটি শনাক্ত হতে সাত দিন সময় লাগে বলে ওই নার্স জানান।
ওই নার্স আরও বলেন, প্রায় প্রতিটি শিফটেই অন্তত একটি প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে রাতে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ব্যথানাশক ওষুধ দিতে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হয়। রোগীদের নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন বা পরিচর্যায়ও দেরি হচ্ছে বলে তিনি জানান।
ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের একটি হাসপাতালের এক চার্জ নার্স জানান, তাদের ইউনিটে ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে পুরোপুরি কর্মী-সমৃদ্ধ কোনো শিফট হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একেকজন নার্সকে একসঙ্গে ১০ জন গুরুতর অসুস্থ রোগীর দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। পার্কিনসনস বা সেপসিসের মতো রোগে নির্দিষ্ট সময়ে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ দেওয়া প্রয়োজন হলেও কর্মী সংকটের কারণে এসব ওষুধেও বিলম্ব হচ্ছে বলে তিনি জানান।
আরসিএনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের পর ইংল্যান্ডে নার্সের সংখ্যা প্রায় ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে চিকিৎসকের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ। সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, নার্সের সংখ্যা চিকিৎসকদের মতো একই হারে বাড়লে বর্তমানে ইংল্যান্ডের এনএইচএসে আরও ৭৭ হাজারের বেশি নার্স থাকত।
হাসপাতালের কার্যক্রম ও রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে নার্সের সংখ্যা তাল মিলিয়ে বাড়েনি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আরসিএনের হিসাবে, ২০০৯-১০ সালের পর থেকে হাসপাতালের কার্যক্রম বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নার্সের সংখ্যা বাড়ানো হলে বর্তমানে আরও প্রায় ৫৫ হাজার নিবন্ধিত নার্স প্রয়োজন হতো।
আরসিএনের মহাসচিব ও প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক নিকোলা রেঞ্জার বলেন, রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যথানাশক বা জরুরি ওষুধের জন্য অপেক্ষা করতে হওয়া এবং কেউ কেউ পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙা বা শারীরিক অবস্থার অবনতির শিকার হওয়া নার্স সংকটের সঙ্গে যুক্ত।
রেঞ্জারের মতে, রোগীর নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয় এবং নার্সের ঘাটতির কারণে কিছু হাসপাতাল ট্রাস্টে প্রতি মাসে শত শত ঘটনা নথিভুক্ত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করা হলে এনএইচএসে আরও কয়েক দশ হাজার নার্স কাজ করতেন।
আরসিএন বলেছে, ইংল্যান্ডের আসন্ন এনএইচএস ১০ বছরের ওয়ার্কফোর্স পরিকল্পনায় নার্সের সংখ্যা এমন পর্যায়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে, যাতে বর্তমান ও ভবিষ্যতের রোগীদের চাহিদা পূরণ করা যায়। একই সঙ্গে হাসপাতাল ট্রাস্টগুলোকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মী নিয়োগের জন্য যথাযথ অর্থায়নের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
সূত্রঃ দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট
এমকে

