20 C
London
June 29, 2026
TV3 BANGLA
প্রবাসে বাংলাদেশ

রোমে বাংলাদেশি পরিবারে ত্রিমুখী হত্যাকাণ্ডঃ পলাতক শাহাদাতের খোঁজে দেশজুড়ে অভিযান

ইতালির রাজধানী রোমে একই পরিবারের তিন বাংলাদেশিকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন তথ্য। ইতালীয় তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, নিহত গৃহবধূ আরজু বেগমের প্রতি একতরফা আসক্তি থেকেই এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারেন প্রধান সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিক শাহাদাত হোসেন। ঘটনার কয়েক দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তার একটি রহস্যময় পোস্টও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচনা করছে ইতালির পুলিশ।

রোমের পশ্চিমাঞ্চলের কাসালোত্তি এলাকায় সংঘটিত এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহত হয়েছেন কামাল উদ্দিন বাবুল, তার স্ত্রী আরজু বেগম এবং তাদের আট বছর বয়সী মেয়ে আরোয়া ইসলাম আরিশা। হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন দম্পতির ২০ বছর বয়সী ছেলে আমির, যিনি বর্তমানে রোমের জেমেলি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন।

ইতালীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ৪৩ বছর বয়সী শাহাদাত হোসেন কয়েক মাস আগে যুক্তরাজ্য থেকে রোমে যান। তদন্তকারীদের ধারণা, তিনি দীর্ঘদিন ধরে আরজু বেগমের প্রতি একতরফাভাবে আসক্ত ছিলেন। তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় ক্ষোভ থেকেই তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি তদন্তকারী সংস্থা।

ঘটনার কয়েক দিন আগে শাহাদাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে লেখেন, “কেউ একা মারা যায় না। সবসময় তার সঙ্গে আরেকজনও মারা যায়। মৃত্যু এলে নিজের প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে যাওয়া উচিত, যাতে কাউকে প্রিয়জন হারানোর কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে না হয়।” তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই পোস্টটি তার মানসিক অবস্থা ও সম্ভাব্য পরিকল্পনার ইঙ্গিত বহন করতে পারে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, স্থানীয় সময় শনিবার রাত ৯টার কিছু পরে শাহাদাত একটি ধারালো দা (ম্যাশেটি) নিয়ে পরিবারের বাসায় প্রবেশ করেন। প্রথমে আরজু বেগম ও তার আট বছর বয়সী মেয়ে আরোয়া ইসলাম আরিশাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরে আরজুর স্বামী কামাল উদ্দিন বাবুলকেও হত্যা করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর তিনজনের মরদেহ বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ। এ সময় বাসায় ফিরে পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করতে গেলে হামলাকারীর সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে গুরুতর আহত হন বড় ছেলে আমির।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রক্তাক্ত অবস্থায় আমির বারবার বলছিলেন, “সে আমার মাকে হত্যা করেছে, আমার পুরো পরিবারকে শেষ করে দিয়েছে।” পুলিশকে দেওয়া প্রাথমিক বক্তব্যেও তিনি হামলাকারী হিসেবে শাহাদাত হোসেনের নাম উল্লেখ করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আগোস্তিনো জানান, তিনি সেদিন রাতে টেলিভিশনে নরওয়ে ও ফ্রান্সের ফুটবল ম্যাচ দেখছিলেন। হঠাৎ চিৎকার শুনে বাইরে বেরিয়ে দেখেন, আমির রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন এবং এক ব্যক্তি তার ওপর হামলা চালাচ্ছে। পরে হামলাকারী ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

ঘটনার পর থেকেই শাহাদাত হোসেন পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারে কাসালোত্তি এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে ইতালির পুলিশ। পাশাপাশি দেশজুড়ে তার সন্ধানে অভিযান চালানো হচ্ছে। শনিবার বিকেলে বোলোনিয়া রেলস্টেশন এলাকায় তার সম্ভাব্য অবস্থানের খবর পাওয়া গেলেও পরে সেটি সঠিক নয় বলে নিশ্চিত হয় পুলিশ।

ঘটনাস্থল থেকে শাহাদাতের ফেলে যাওয়া মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। সেটির তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি নিহত পরিবারের স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারীরা।

স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, নিহত পরিবার ও অভিযুক্ত শাহাদাত হোসেন—উভয়ের বাড়িই বাংলাদেশের নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়। কামাল উদ্দিন ২০০৯ সালে স্ত্রীকে নিয়ে ইতালিতে পাড়ি জমান। অন্যদিকে প্রায় ছয় মাস আগে শাহাদাত তার স্ত্রীকে নিয়ে লন্ডন থেকে রোমে চলে আসেন।

স্থানীয়দের দাবি, শাহাদাত দীর্ঘদিন ধরেই আরজু বেগমের প্রতি অস্বাভাবিকভাবে আসক্ত ছিলেন। তবে তাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল কি না, সে বিষয়ে বিভিন্ন গুঞ্জন থাকলেও ইতালির পুলিশ এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য দেয়নি।

এ ঘটনায় রোমের প্রসিকিউটর অফিস হত্যা এবং গুরুতর আহত করার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, পলাতক শাহাদাত হোসেনকে দ্রুত গ্রেপ্তার করাই এখন তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এরপর হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য, ঘটনার পেছনের কারণ এবং সম্ভাব্য অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে উদঘাটন করা হবে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের প্রাথমিক ধারণা, আরজু বেগমকে নিজের একচ্ছত্র অধিকার হিসেবে দেখতেন শাহাদাত হোসেন। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়ায় ক্ষোভ থেকেই তিনি শুধু আরজু বেগম নন, তার স্বামী ও নিষ্পাপ শিশুকন্যাকেও নির্মমভাবে হত্যা করেন বলে তদন্তকারীরা সন্দেহ করছেন। তবে ইতালীয় পুলিশ জোর দিয়ে বলছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হচ্ছে না।

সূত্রঃ স্যোশাল মিডিয়া

এম.কে

আরো পড়ুন

আম কূটনীতি, হিমসাগর সুইডেনে

তুরস্কের ই-ভিসা চালু বাংলাদেশিদের জন্য

পনের বছরের গবেষণার ফল প্রকাশ করল লন্ডন সালাহ টাইমটেবিল ইউনিফাইড উলামা কমিটি