ব্রিটেনে পিতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ ও বেতন বাড়ানোর দাবিতে বাবা ও লেবার এমপিদের একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। ডেইলি মিররের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবার পার্টির সম্মেলনের প্রথম দিনে দেশটির বিভিন্ন শহর ও নগরে ‘দ্য ড্যাড শিফট’ নামে একটি প্রচারাভিযানের উদ্যোগে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
প্রতিবাদের অংশ হিসেবে কয়েক ডজন শহরে বাবা ও তাদের শিশুরা অংশ নেয়। আয়োজকদের পক্ষ থেকে এটিকে বিশ্বের প্রথম ‘মাস চেঞ্জ-ইন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কর্মসূচিতে শিশুদের ডায়াপারে বাদামি কালি দিয়ে লেখা হয়—‘দুই সপ্তাহ খুবই কম’।
যুক্তরাজ্যে বর্তমানে যোগ্য কর্মীরা সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহের পিতৃত্বকালীন ছুটি নিতে পারেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পিতৃত্বকালীন ছুটি এবং পিতৃত্বকালীন বেতন আলাদা বিষয় এবং উভয়ের জন্য যোগ্যতার শর্ত রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিধিবদ্ধ পিতৃত্বকালীন বেতনের হার সপ্তাহে ১৯৪ দশমিক ৩২ পাউন্ড অথবা কর্মীর গড় সাপ্তাহিক আয়ের ৯০ শতাংশ—যেটি কম—হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে।
‘দ্য ড্যাড শিফট’-এর দাবি, অনেক নিম্ন আয়ের বাবা এই অর্থে দুই সপ্তাহ ছুটি কাটানোর সামর্থ্য রাখেন না। সংগঠনটির বক্তব্য, উচ্চ আয়ের কর্মীরা অনেক সময় নিয়োগকর্তার কাছ থেকে অতিরিক্ত সুবিধা পান, কিন্তু কম আয়ের কর্মীদের সেই সুযোগ থাকে না। ফলে সন্তান জন্মের পর দ্রুত কাজে ফিরে যাওয়ার চাপ তৈরি হয়।
সংগঠনটির প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত এক দশকে বিধিবদ্ধ পিতৃত্বকালীন বেতনের দাবির প্রায় ৯০ শতাংশই সর্বোচ্চ আয়ের অর্ধেকের মধ্যে থাকা ব্যক্তিদের কাছে গেছে। সর্বনিম্ন আয়ের অর্ধেকের মধ্যে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। একই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মাতৃত্বকালীন বেতনের ক্ষেত্রে নিম্ন আয়ের অর্ধেকের মধ্যে থাকা ব্যক্তিদের অংশ ছিল প্রায় ৩১ শতাংশ।
পোর্টসমাউথ নর্থের লেবার এমপি ও লেবার মেন অ্যান্ড বয়েজ গ্রুপের সহসভাপতি আমান্ডা মার্টিন পিতৃত্বকালীন ছুটির বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তনের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, সন্তান জন্মের পরপরই কর্মজীবী বাবাদের কাজে ফিরে যেতে বাধ্য করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে এবং এটি যথেষ্ট নয়।
হাই পিকের লেবার এমপি জন পিয়ার্সও পিতৃত্বকালীন ছুটির নিয়ম পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। তার নেতৃত্বে ১০৪ জন এমপি প্রধানমন্ত্রী এন্ডি বার্নহ্যামের কাছে পিতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন বলে ডেইলি মিরর জানিয়েছে।
পিয়ার্স বলেন, বাবা হিসেবে তার নিজেরও এমন অনুভূতি হয়েছে যে কর্মক্ষেত্র ও পরিবার—দুই জায়গাতেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন, কারণ বিদ্যমান ব্যবস্থা বাবাদের পর্যাপ্ত সহায়তা দেওয়ার জন্য যথেষ্টভাবে তৈরি নয়।
এদিকে সরকার জানিয়েছে, পিতৃত্ব ও মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং বেতনব্যবস্থা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা চলছে। কর্মসংস্থানমন্ত্রী কেট ডিয়ার্ডেন বলেন, সন্তানের জন্মের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ বাবা ও সঙ্গীদের যাতে যতটা সম্ভব পাশে থাকার সুযোগ থাকে, সরকার তা নিশ্চিত করতে চায়।
সরকার ইতোমধ্যে পিতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রে একটি পরিবর্তন কার্যকর করেছে। ৬ এপ্রিল ২০২৬ থেকে নতুন চাকরিতে যোগদানের প্রথম দিন থেকেই পিতৃত্বকালীন ছুটির অধিকার পাওয়া যাচ্ছে। এর ফলে আনুমানিক ৩২ হাজার অতিরিক্ত বাবা ও সঙ্গী প্রতি বছর চাকরির শুরু থেকেই এই ছুটির সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে পিতৃত্বকালীন ছুটির অধিকার প্রথম দিন থেকেই পাওয়া গেলেও বিধিবদ্ধ পিতৃত্বকালীন বেতনের যোগ্যতার নিয়ম একই রয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, পিতৃত্বকালীন বেতন পেতে সাধারণত একই নিয়োগকর্তার অধীনে অন্তত ২৬ সপ্তাহ কাজ করা এবং নির্ধারিত গড় সাপ্তাহিক আয়ের শর্ত পূরণ করতে হয়।
এছাড়া ৬ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কর্মীরা নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার প্রথম দিন থেকেই বিনা বেতনের প্যারেন্টাল লিভের অধিকারও পেয়েছেন। একই সঙ্গে বাবা ও সঙ্গীরা এখন শেয়ার্ড প্যারেন্টাল লিভ ও পেমেন্ট নেওয়ার পর পিতৃত্বকালীন ছুটি ও বেতন নেওয়ার সুযোগও পাচ্ছেন।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, নতুন নিয়ম ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রযোজ্য। প্যারেন্টাল লিভ-সংক্রান্ত আইন উত্তর আয়ারল্যান্ডে আলাদাভাবে পরিচালিত হয়।
প্রতিবাদ কর্মসূচিতে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আনা হোয়াইটহাউস, সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্স ট্রিপিয়ার এবং মুভেম্বারের দূত জিম চ্যাপম্যান, গর্ডন স্মার্ট ও জেসন ফো অংশ নেন বলে ডেইলি মিরর জানিয়েছে।
প্রতিবাদে টেসকোও সমর্থন জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চিফ পিপল অফিসার এমা টেলর জানান, টেসকো কর্মীদের ছয় সপ্তাহের পূর্ণ বেতনসহ পিতৃত্বকালীন ছুটি দেয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সন্তানের জন্মের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ পরিবারকে সময় দেওয়ার সুযোগ কর্মী ও পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে সরকারের চলমান প্যারেন্টাল লিভ অ্যান্ড পে রিভিউয়ের আওতায় মাতৃত্বকালীন ছুটি, পিতৃত্বকালীন ছুটি, বেতন এবং শেয়ার্ড প্যারেন্টাল লিভসহ পুরো ব্যবস্থাটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সরকারের বর্তমান আইনে পিতৃত্বকালীন ছুটি সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ হলেও পর্যালোচনার ফলাফল অনুযায়ী ভবিষ্যতে ব্যবস্থা পরিবর্তন হবে কি না, তা এখনো চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
সূত্রঃ মিরর
এমকে

