TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

সব ধর্মের মর্যাদা রক্ষার বার্তাঃ রাজা চার্লসের নতুন পরিচয় তুলে ধরল বাকিংহাম প্যালেস

যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লসের সাংবিধানিক ভূমিকার বর্ণনায় গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগত পরিবর্তন এনেছে বাকিংহাম প্যালেস। রাজপরিবারের সরকারি অর্থায়ন-সংক্রান্ত ২০২৫–২৬ সালের সোভরেন গ্রান্ট প্রতিবেদনে গত বছরের তুলনায় নতুনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজা তৃতীয় চার্লস “বহুধর্মীয় জাতির মধ্যে ধর্মচর্চার জন্য প্রয়োজনীয় পরিসর রক্ষা করেন।” গত বছরের প্রতিবেদনে একই স্থানে তাকে “চার্চ অব ইংল্যান্ডের প্রধান এবং খ্রিস্টান ধর্মের রক্ষক” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহারাজ চার্লস চার্চ অব ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য ধর্ম পালনের স্বাধীন পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

তবে বাকিংহাম প্যালেস স্পষ্ট করেছে, এটি কেবল একটি বার্ষিক আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রতিবেদন। এতে রাজার আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক উপাধি বা চার্চ অব ইংল্যান্ডের সাংবিধানিক অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। অর্থাৎ, আইনগতভাবে “ডিফেন্ডার অব দ্য ফেইথ” উপাধি বহাল রয়েছে।

প্রতিবেদনে রাজা চার্লসকে দাতব্য কর্মকাণ্ডের অন্যতম অনুপ্রেরণাদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তিনি জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে জনগণের মধ্যে ঐক্য, স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতার অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে তিনি নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন।

রাজা চার্লসের এই অবস্থান নতুন নয়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বাকিংহাম প্যালেসে বিভিন্ন ধর্মীয় নেতার সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেছিলেন, ব্রিটেনকে তিনি সবসময় “বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে গঠিত একটি সমাজ” হিসেবে দেখেন। সে সময় তিনি বলেন, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার অন্যতম দায়িত্ব হলো দেশের বৈচিত্র্য রক্ষা করা এবং সব ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষের ধর্মচর্চার জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।

এরও আগে, ২০২১ সালে এক ভাষণে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠাকে নিজের জীবনের অন্যতম প্রধান কাজ বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি।

ইতিহাস বলছে, “ডিফেন্ডার অব দ্য ফেইথ” উপাধির সূচনা ১৫২১ সালে। পোপ লিও দশম ক্যাথলিক মতবাদ রক্ষায় ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরিকে এই উপাধি প্রদান করেন। পরে তিনি রোমান ক্যাথলিক চার্চ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চার্চ অব ইংল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করলে পোপ সেই উপাধি প্রত্যাহার করেন। কিন্তু ১৫৪৪ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আইন করে পুনরায় এই উপাধি রাজা এবং তার উত্তরসূরিদের জন্য বহাল রাখে। এরপর থেকে প্রতিটি ব্রিটিশ সম্রাট এই উপাধি ব্যবহার করে আসছেন এবং এখনও যুক্তরাজ্যের মুদ্রা ও সরকারি নথিতে এর লাতিন সংক্ষিপ্ত রূপ ‘এফ.ডি.’ ব্যবহার করা হয়।

রাজা তৃতীয় চার্লসের অভিষেকের আগে ধারণা করা হয়েছিল, তিনি হয়তো প্রচলিত “ডিফেন্ডার অব দ্য ফেইথ”-এর পরিবর্তে “ডিফেন্ডার অব ফেইথ” অর্থাৎ সব ধর্মের রক্ষক—এমন কোনো নতুন উপাধি গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রচলিত সাংবিধানিক উপাধিই বহাল রাখেন এবং চার্চ অব ইংল্যান্ড ও প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মের অধিকার রক্ষার শপথ নেন।

ইসলাম ও মুসলিম বিশ্বের প্রতি রাজা চার্লসের দীর্ঘদিনের আগ্রহও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রিন্স অব ওয়েলস থাকাকালীন থেকেই তিনি ইসলামি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা দিয়েছেন। ১৯৯৩ সালে অক্সফোর্ড সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজে তিনি বলেন, পশ্চিমা সভ্যতা ইসলামি বিশ্বের জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির কাছে অনেক ঋণী হলেও সে বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন নয়।

২০০৩ সালে তিনি মুসলিম গণিতবিদদের অবদানের প্রশংসা করে বলেন, আরবি সংখ্যা ও শূন্যের ধারণা ইউরোপীয় সভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০০৬ সালে মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ইউরোপের অন্ধকার যুগে ইসলামি পণ্ডিতরাই ধ্রুপদি জ্ঞান সংরক্ষণ করেছিলেন।

এছাড়া কোরআন মূল ভাষায় পড়ার আগ্রহ থেকে তিনি আরবি ভাষাও শিখেছেন বলে বিভিন্ন সময়ে জানা গেছে। তার ব্যক্তিগত বাসভবন হাইগ্রোভের বাগানেও কোরআনে উল্লেখিত উদ্ভিদ এবং ইসলামি শিল্প-ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত নকশার ব্যবহার রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদিও নতুন প্রতিবেদনের ভাষাগত পরিবর্তনে রাজার সাংবিধানিক অবস্থান বদলায়নি, তবুও এটি বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক যুক্তরাজ্যে রাজতন্ত্রের ভূমিকা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বিশেষ করে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সামাজিক সংহতি এবং বিভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের সহাবস্থানের প্রতি রাজা চার্লসের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হিসেবেই এই পরিবর্তনকে দেখা হচ্ছে।

সূত্রঃ স্যোশাল মিডিয়া

এম.কে

আরো পড়ুন

‘দেশ ছাড়েনি তবু ভাতা বন্ধ’: যুক্তরাজ্যে সরকারের অ্যান্টি–ফ্রড সিস্টেমে মারাত্মক ভুল

বিলেতে বাড়ি কেনাবেচা: মর্গেজ এপ্লিকেশনে কি কি ডকুমেন্ট প্রয়োজন

অনলাইন ডেস্ক

বেলফাস্টে অভিবাসীবিরোধী হামলায় আতঙ্কঃ ঘরবন্দি ৩ হাজার বাংলাদেশি

নিউজ ডেস্ক