দাসপ্রথার ক্ষতিপূরণ দাবিকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে যুক্তরাজ্যে। দেশটির রাজনৈতিক দল রিফর্ম ইউকে ঘোষণা দিয়েছে, যেসব দেশ অতীতের দাসপ্রথার জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করছে, সেসব দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রদান বন্ধ করা হবে।
দলের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র জিয়া ইউসুফ এক সাক্ষাৎকারে ক্ষতিপূরণের দাবিকে “অপমানজনক” আখ্যা দিয়ে বলেন, গত দুই দশকে এমন দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য প্রায় ৩৮ লাখ ভিসা প্রদান করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এসব দেশ ইতিহাসকে ব্যবহার করে যুক্তরাজ্যের অর্থভাণ্ডারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “যারা অতীতকে হাতিয়ার বানিয়ে আমাদের সম্পদ নিঃশেষ করতে চায়, তাদের জন্য এখনই দ্বার বন্ধ। যুক্তরাজ্য কোনো অর্থ উত্তোলনের যন্ত্র নয়, এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন আচরণ আর সহ্য করা হবে না।”
ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, প্রায় চার শতাব্দী ধরে যুক্তরাজ্যসহ সাতটি ইউরোপীয় দেশ আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ১ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি আফ্রিকান মানুষকে দাস হিসেবে বন্দি করে নিয়ে যায়। ইতিহাসবিদদের মতে, এই দাসপ্রথা থেকে অর্জিত সম্পদই পশ্চিমা বিশ্বের শিল্পায়নের ভিত্তি গড়ে দেয়।
সম্প্রতি জাতিসংঘ এক প্রস্তাবে আটলান্টিক দাসবাণিজ্যকে “মানবতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধ” হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং অতীতের অন্যায় সংশোধনের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদানের আহ্বান জানায়। এই প্রস্তাব আফ্রিকান ইউনিয়ন ও ক্যারিবীয় কমিউনিটি সমর্থন করে।
ঘানার প্রেসিডেন্ট জন ড্রামানি মাহামা এই প্রস্তাব উত্থাপন করে বলেন, ইতিহাসের এই মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন, যাতে দাসপ্রথার শিকার লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়।
তবে প্রস্তাবের ভোটাভুটিতে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলো বিরত থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র এর বিপক্ষে ভোট দেয়। যদিও এই প্রস্তাব আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়, তবুও এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্ষতিপূরণ ইস্যুকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
অন্যদিকে, রিফর্ম ইউকে আগেই ঘোষণা দিয়েছিল, যারা ক্ষতিপূরণ দাবি করছে তাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তাও বন্ধ করা হবে।
২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সাবেক বিচারক প্যাট্রিক রবিনসনের নেতৃত্বে প্রস্তুত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আটলান্টিক দাসবাণিজ্যের জন্য শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যকেই ১৪টি দেশে প্রায় ২৪ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে।
তবে ক্যারিবীয় রিপারেশনস কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের লক্ষ্য কোনো দেশের অর্থভাণ্ডার ধ্বংস করা নয়। বরং তারা যুক্তরাজ্য ও সাবেক উপনিবেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে একটি ন্যায়ভিত্তিক পুনর্বাসন কর্মসূচি গড়ে তুলতে চায়।
কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক স্যার হিলারি বেকলস এক বক্তব্যে বলেন, “ক্ষতিপূরণ নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা ছড়ানো হচ্ছে। এটি কোনো অর্থ আদায়ের বিষয় নয়, বরং এটি একটি নৈতিক ও ন্যায়সংগত দাবি, যা ইতিহাসের অন্যায়ের প্রতিকার চায়।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ইস্যুতে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উভয় ক্ষেত্রেই নতুন উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

