21.8 C
London
September 19, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

সাইবার হামলার মতো ভয়াবহ বিপর্যয়ঃ সফটওয়্যার ত্রুটিতে অচল ছিল যুক্তরাজ্যের আকাশপথ

যুক্তরাজ্যের আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ভয়াবহ বিপর্যয়ের নেপথ্যে ছিল একটি পুরোনো ও আগে অজানা সফটওয়্যার ত্রুটি। মাত্র এক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে ফ্লাইটের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিকৃত হয়ে যাওয়ার পর দেশজুড়ে বিমান চলাচলে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। তবে এখন পর্যন্ত ঘটনাটিকে সাইবার হামলা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
ন্যাশনাল এয়ার ট্রাফিক সার্ভিসেস বা নাটস জানিয়েছে, ৮ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় তাদের ন্যাশনাল এয়ারস্পেস সিস্টেমের একটি অংশে সফটওয়্যার ত্রুটির কারণে ফ্লাইট-সংক্রান্ত তথ্য নষ্ট হয়ে যায়। এর পরিণতিতে যুক্তরাজ্যজুড়ে ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব এবং বিমানবন্দরগুলোতে ব্যাপক ভিড় তৈরি হয়।
নাটসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ত্রুটিটি প্রথম দেখা দেয় সকাল ১০টার দিকে। মাত্র দুই মিনিট পর বিষয়টি প্রকৌশলীদের জানানো হয়। তারা তদন্ত শুরু করলে সকাল ১০টা ৬ মিনিটের মধ্যে সিস্টেমটি আবার সচল হয়েছে বলে মনে হয়। তখন তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো কার্যক্রমগত প্রভাব দেখা যায়নি।
কিন্তু দুপুর ১২টা ৩২ মিনিটে ন্যাশনাল এয়ারস্পেস সিস্টেমের সঙ্গে লন্ডন এলাকার এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সংযোগ আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর বড় ধরনের ঘটনা ঘোষণা করা হয় এবং বিমান নিয়ন্ত্রকদের কিছু কাজ ম্যানুয়ালি সম্পন্ন করতে হয়।
দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে নাটস ফ্লাইট চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করতে শুরু করে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে দুপুর ১টা ৩২ মিনিটে সিস্টেমটি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।
বিমান সংস্থাগুলোকে দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে বিধিনিষেধের বিষয়ে জানানো হয়। এরপর দুপুর ২টা ৫০ মিনিট থেকে বিকেল ৪টা ৯ মিনিট পর্যন্ত সিস্টেম পুনরায় চালুর জন্য কাজ করা হয়। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম ফিরলেও ততক্ষণে বিমান চলাচলে বড় ধরনের জট তৈরি হয়ে যায়।
এই বিপর্যয়ের ফলে দুই হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল হয় এবং কয়েক লাখ যাত্রীর ভ্রমণ পরিকল্পনা ব্যাহত হয়। তৈরি হওয়া বিমান ও যাত্রী জট পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে দুই দিনেরও বেশি সময় লেগে যায়।
নাটসের প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটিকে ‘লিগ্যাসি’ বা পুরোনো এবং আগে অজানা সফটওয়্যার ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি অত্যন্ত নির্দিষ্ট ঘটনার সমন্বয়ে ত্রুটিটি সক্রিয় হয়।
বিমান শনাক্ত করতে ব্যবহৃত কোড বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় সমস্যাটি দেখা দেয়। একটি উড়োজাহাজের কোডের জন্য ম্যানুয়াল অনুরোধ প্রক্রিয়াধীন থাকা অবস্থায় সেটি অন্য একটি ‘উচ্চ অগ্রাধিকারের’ কাজের কারণে সাময়িকভাবে থেমে যায়। পরে প্রক্রিয়াটি আবার শুরু হলে সফটওয়্যার ত্রুটির কারণে সেটি সঠিকভাবে চালু হয়নি। ফলে তৈরি হওয়া তথ্য বিকৃত হয়ে যায় এবং পরবর্তী কিছু ফ্লাইটের তথ্য হালনাগাদেও প্রভাব পড়ে।
নাটসের ভাষ্য অনুযায়ী, এই তথ্য বিকৃত হওয়ার ঘটনাটি ঘটেছিল মাত্র এক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে।
ঘটনার পর নাটসের প্রধান নির্বাহী মার্টিন রোলফে জানিয়েছেন, সমস্যাটি শনাক্ত করা হয়েছে এবং স্থায়ী সমাধান নিরাপত্তা পরীক্ষার পর বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের কাছে আবারও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
রোলফে বলেন, নাটসের প্রধান দায়িত্ব যুক্তরাজ্যের আকাশপথ নিরাপদ রাখা। তার দাবি, ঘটনার কোনো পর্যায়েই বিমান চলাচলের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়েনি।
তবে যুক্তরাজ্য সরকার নাটসের প্রতিবেদনে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়। পরিবহনমন্ত্রী হেইডি আলেকজান্ডার বলেছেন, কী কারণে সফটওয়্যার ত্রুটিটি আগে শনাক্ত ও ঠিক করা হয়নি এবং কেন এটি শেষ পর্যন্ত এত বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করল, তা জরুরি ভিত্তিতে বোঝা প্রয়োজন।
এ কারণে দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিভিল এভিয়েশন অথরিটি বা সিএএ-কে একটি স্বাধীন পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সিএএ নাটসের তদন্তের ফলাফল যাচাই করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে নাটসের বিনিয়োগ পরিকল্পনা, ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা এবং নিয়ন্ত্রক জবাবদিহিতা পরীক্ষা করবে। ছয় মাসের মধ্যে এই পর্যালোচনার প্রতিবেদন প্রকাশ করার কথা রয়েছে।
এদিকে বিমানশিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন এয়ারলাইন্স ইউকে নাটসের ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে বড় ধরনের বিনিয়োগের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী টিম অ্যাল্ডারস্লেড বলেছেন, একটি মাত্র ত্রুটি যেন আবারও পুরো যুক্তরাজ্যে বিমান চলাচল বিপর্যস্ত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিমান সংস্থাগুলো নাটসের কাছে বিপর্যয়ের কারণে তাদের হওয়া ব্যয়ের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা দাবি করছে।
ইজিজেটের প্রধান নির্বাহী কেন্টন জার্ভিস বলেছেন, শুধু ভবিষ্যতে শিক্ষা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। বিমান সংস্থাগুলো যেন একাই এই বিপর্যয়ের আর্থিক বোঝা বহন না করে, সে জন্য একটি ন্যায্য সমাধান প্রয়োজন।
অন্যদিকে রায়ানএয়ারের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা নিল ম্যাকমাহন সফটওয়্যার ত্রুটিকে কেন্দ্র করে দেওয়া ব্যাখ্যার সমালোচনা করেছেন। তিনি যুক্তরাজ্যের বিমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় গত কয়েক বছরে একাধিক বড় ধরনের সমস্যার কথা উল্লেখ করে নাটসের নেতৃত্বের জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
নাটসের প্রধান নির্বাহী অবশ্য জানিয়েছেন, এবারের ঘটনা আগের বিমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যর্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। তার দাবি, এবারের ত্রুটি সামরিক বা বেসামরিক কোনো অপারেটরের ভুল পদক্ষেপের কারণে ঘটেনি।
সরকারের ইন্ডিপেন্ডেন্ট তদন্তের ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এই বিপর্যয়ের পূর্ণ কারণ এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, তা নিয়ে আরও তথ্যের অপেক্ষা রয়েছে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এমকে

আরো পড়ুন

অভিনব ‘ভিসা প্রতারণা’ করে যুক্তরাজ্যে ঢুকছে বহু পাকিস্তানি

মৌসুমি শ্রমিক সংকটে যুক্তরাজ্য

যুক্তরাজ্যের অভিবাসন বিধিতে কারিগরি সংশোধনঃ জুলাই-আগস্ট ২০২৬-এর পরিবর্তনসমূহ