যুক্তরাজ্যের সরকারের প্রস্তাবিত নতুন আশ্রয় ও অভিবাসননীতি নিয়ে বিরোধিতা আরও জোরালো হয়েছে। দেশটির ২০০টিরও বেশি শরণার্থী ও মানবাধিকারভিত্তিক দাতব্য সংস্থা প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের কাছে একটি যৌথ খোলা চিঠি দিয়ে আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নেওয়া ‘ব্যর্থ ও প্রদর্শনমূলক’ নীতিগুলো থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাগুলোর দাবি, গত কয়েক বছরে শরণার্থীদের প্রতি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে কোনো সরকারই জনআস্থা অর্জন করতে পারেনি। বরং এসব পদক্ষেপ মানবিক সংকটকে আরও গভীর করেছে, করদাতাদের অর্থ অপচয় করেছে এবং সমাজে বিভাজন বাড়িয়েছে।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে ডক্টরস অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইউকে, ফ্রিডম ফ্রম টর্চার, সিটি অব স্যাংচুয়ারি এবং জয়েন্ট কাউন্সিল ফর দ্য ওয়েলফেয়ার অব ইমিগ্র্যান্টস (জেসিডব্লিউআই)। তারা প্রধানমন্ত্রীকে শাবানা মাহমুদের প্রস্তাবিত আশ্রয়নীতি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, আশ্রয়প্রার্থীদের সাবেক সামরিক ঘাঁটিতে রাখার পরিকল্পনা বাতিল করতে হবে, তাদের কাজ করার সুযোগ দিতে হবে এবং প্রস্তাবিত £১০ হাজারের ‘শরণার্থী কর’ প্রত্যাহার করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার পুনর্মিলনসহ নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের পথ আরও সম্প্রসারণেরও দাবি জানানো হয়েছে।
চিঠিতে দাতব্য সংস্থাগুলো উল্লেখ করেছে, আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বৈরিতাপূর্ণ রাজনৈতিক ভাষা ও কঠোর নীতির কারণে কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো আরও উৎসাহিত হয়েছে। এর ফলে শরণার্থী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বেড়েছে এবং সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের ভাষ্য, প্রমাণভিত্তিক সমাধান ও আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা এসব পদক্ষেপ যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক সুনামও ক্ষুণ্ন করছে।
আশ্রয়প্রার্থী বিষয়ক সংগঠন Asylum Matters-এর ক্যাম্পেইনস প্রধান নাথান ফিলিপস বলেন, রুয়ান্ডা পরিকল্পনা থেকে শুরু করে নতুন ‘শরণার্থী কর’—এ ধরনের প্রতিটি কঠোর উদ্যোগই ব্যর্থ হয়েছে। এগুলো আশ্রয়ব্যবস্থার সমস্যার সমাধান তো করেইনি, বরং সরকারি অর্থের অপচয় ঘটিয়েছে, আশ্রয়প্রার্থীদের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে এবং সমাজে ঘৃণা ও বিভাজনকে আরও উসকে দিয়েছে। তার মতে, মানবিকতা ও কার্যকারিতাকে ভিত্তি করে একটি আশ্রয়ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম সম্প্রতি শাবানা মাহমুদকে পুনরায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে স্পষ্ট করেছেন যে সরকার আপাতত তাদের ঘোষিত আশ্রয়সংস্কার থেকে সরে আসছে না। সরকারের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম বিল-এ শরণার্থী মর্যাদাকে স্থায়ী না রেখে প্রতি আড়াই বছর অন্তর পুনর্মূল্যায়নের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নিজ দেশ নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি পাওয়া শরণার্থীদের কাছ থেকে প্রায় £১০ হাজার ফি আদায় এবং স্থায়ী বসবাসের অনুমতি (আইএলআর) পেতে ২০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষার প্রস্তাবও ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এসব প্রস্তাব শুধু মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নয়, ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে দলটির প্রায় ৮০ জন এমপি সরকারকে সংস্কার পরিকল্পনা শিথিল করার আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
তবে সরকারের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হলো নির্যাতনের শিকার মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তবে একই সঙ্গে সীমান্ত সুরক্ষা, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং সমাজে অবদানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি। তিনি জানান, আগামী বছর থেকে নতুন নিরাপদ ও বৈধ শরণার্থী-পথ চালু করা হবে। এছাড়া ইমিগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম বিল আশ্রয়ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধ করবে এবং মানবাধিকার আইনে সংস্কারের মাধ্যমে প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে বলে সরকারের বিশ্বাস।
সূত্রঃ জিবি নিউজ
এম.কে

