27 C
London
June 16, 2026
TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

স্পেনে অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতার সুযোগঃ সাধারণ ক্ষমা কর্মসূচির আবেদনে ১০ লাখের বেশি অভিবাসী

স্পেনে অবৈধভাবে বসবাসরত অভিবাসীদের জন্য চালু করা সাধারণ ক্ষমা কর্মসূচিতে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ আবেদন করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির সরকার শুরুতে প্রায় পাঁচ লাখ অনথিভুক্ত অভিবাসী এই সুযোগ গ্রহণ করবেন বলে মনে করলেও, বাস্তবে আবেদনকারীর সংখ্যা সেই পূর্বাভাসের দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

স্পেনের অভিবাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে প্রায় ৯ লাখ আবেদন জমা পড়েছে। শরণার্থী সহায়তাকারী অলাভজনক সংস্থা সিইএআর (CEAR) জানিয়েছে, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আবেদনকারীর সংখ্যা ১০ লাখ অতিক্রম করবে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের উদ্যোগে চালু হওয়া এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে বসবাস ও কর্মরত কাগজপত্রহীন অভিবাসীদের বৈধতার আওতায় আনা। মধ্য-বামপন্থী এই নেতা মনে করেন, অনথিভুক্ত অভিবাসীদের নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা শুধু মানবিক পদক্ষেপই নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গত দুই বছরে স্পেনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইউরোপের বেশিরভাগ দেশের তুলনায় দ্রুতগতিতে এগিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পর্যটন, কৃষি এবং বয়স্কদের সেবাখাতের মতো শ্রমনির্ভর খাতে অভিবাসীদের অবদান এই প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে তাদের অংশগ্রহণও বেড়েছে।

প্রধানমন্ত্রী সানচেজের ভাষ্য, এই সাধারণ ক্ষমা কর্মসূচির মাধ্যমে অভিবাসীদের বৈধ কর্মসংস্থানের আওতায় আনা গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে এবং দেশের সরকারি পেনশন ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী হবে।

অভিবাসন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার অস্থায়ী কর্মসংস্থান অনুমতিপত্র ইস্যু করা হয়েছে, যা মোট আবেদনের প্রায় ৪০ শতাংশের সমান। কোনো আবেদন প্রক্রিয়াকরণের জন্য গ্রহণ করা হলে আবেদনকারী সঙ্গে সঙ্গেই কাজ শুরু করার সুযোগ পান।

স্পেনের অভিবাসনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী পিলার ক্যানসেলা রদ্রিগেজ বলেছেন, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে প্রায় ১০ লাখ আবেদন প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা সরকারের রয়েছে। তবে আবেদনকারীর সংখ্যা অনুমোদিত পারমিটের চেয়ে বেশি হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ডিক্রির মাধ্যমে কার্যকর করা এই আইনের আওতায় যেসব ব্যক্তি কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত নন এবং অন্তত পাঁচ মাস ধরে স্পেনে বসবাসের প্রমাণ দিতে পারবেন, তারা এক বছরের জন্য নবায়নযোগ্য আবাসিক অনুমতিপত্রের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

এ ছাড়া আবেদনকারীদের আরও তিনটি শর্তের যেকোনো একটি পূরণ করতে হবে। সেগুলো হলো— স্পেনে কাজ করার প্রমাণ উপস্থাপন, দেশটিতে পারিবারিক সম্পর্ক থাকা অথবা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থাকার তথ্য প্রদান।

তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান বিরোধী দল পিপলস পার্টি (পিপি) দাবি করেছে, প্রায় ১২ লাখ মানুষ এই সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নিতে পারেন। দলটির অভিযোগ, যখন সাধারণ স্প্যানিশ নাগরিকরা প্রতিনিয়ত জনসেবার অবনতির মুখোমুখি হচ্ছেন, তখন সরকার অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতা দেওয়ার নীতি অনুসরণ করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক কেলেঙ্কারিতে চাপে থাকা প্রধানমন্ত্রী সানচেজ এই ইস্যুর মাধ্যমে নিজেকে ইউরোপের উদারপন্থী অভিবাসননীতির অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে তুলে ধরছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির বিপরীতে তিনি মানবিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশিরভাগ দেশ বর্তমানে অভিবাসন ইস্যুতে কঠোর নীতি গ্রহণ করলেও স্পেন ব্যতিক্রমী অবস্থান নিয়েছে। অনেক দেশ যেখানে অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো বা তৃতীয় দেশে স্থানান্তরের মতো কৌশল গ্রহণ করছে, সেখানে স্পেন দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে বসবাসরত অভিবাসীদের বৈধতা দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে।

তবে ইউরোপীয় কমিশন স্পষ্ট করেছে যে, স্পেনে এই সাধারণ ক্ষমার আওতায় বৈধতা পাওয়া অভিবাসীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে বসবাস বা কাজ করার অধিকার পাবেন না।

উল্লেখ্য, ১৯৮৬ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে স্পেনে ছয়বার একই ধরনের সাধারণ ক্ষমা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, যার মধ্যে রক্ষণশীল সরকারগুলোর আমলেও এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এদিকে বিরোধী দল পিপির নেতা আলবার্তো নুনিয়েস ফেইহো এই নীতিকে “অমানবিক” আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি মানবপাচারকারী চক্রগুলোকে আরও উৎসাহিত করবে। তার মতে, এই উদ্যোগ “অন্যায্য, অনিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়”।

কট্টর ডানপন্থী দল ভক্সও এই সাধারণ ক্ষমার বিরোধিতা করেছে। দলটি বরাবরই কঠোর অভিবাসন নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৭ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে অভিবাসন ইস্যু স্পেনের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে বিরোধী পিপি ক্ষমতায় এলে ভক্সের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে আরও কঠোর অভিবাসন নীতি গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্পেনের দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ অভিবাসন ব্যবস্থার কারণে হাজারো মানুষ বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছেন। চিন্তাকেন্দ্র ফুনকাসের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার অনথিভুক্ত অভিবাসী বিভিন্ন ধরনের আবাসিক অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছেন এবং এ সময় তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

সিইএআর-এর পরিচালক মনিকা লোপেজ বলেন, “এটি নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমধর্মী কর্মসূচি। তবে দীর্ঘমেয়াদে এমন কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন, যাতে মানুষকে বছরের পর বছর সমাজের প্রান্তিক অবস্থায় থেকে কাজ ও বসবাসের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করতে না হয়।”

তার মতে, সাধারণ ক্ষমা সাময়িক সমাধান দিতে পারে, কিন্তু অভিবাসন ব্যবস্থার স্থায়ী সংস্কার ছাড়া সমস্যার মূল কারণ দূর করা সম্ভব নয়।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

মাস্কের সরে দাঁড়ানোয় ট্রাম্প প্রশাসনে নীতিনির্ধারণে ফের আধিপত্য মন্ত্রিসভার

যুক্তরাষ্ট্রে ভয়ংকর মাদক ফেন্টানিলের কাঁচামাল পাঠাচ্ছে ভারতঃ তুলসী গ্যাবার্ডের দপ্তর

নিজের সন্তানদের বিরাট বাহিনী গড়তে মরিয়া ইলন মাস্ক