রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজ এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সালমান মুক্তাদির ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যে তৈরি হয়েছে তীব্র পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া। সালমান হামলার পেছনে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের দায়ী করার দাবি করলেও পুলিশ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটির সঙ্গে প্রায় ৩৫ কাঠা জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধের যোগসূত্রের কথা বলা হয়েছে।
শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজ এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ আশপাশের কয়েকটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্টুডিওর চেয়ার, টেবিল, টেলিভিশন, ক্যামেরা, রেকর্ডিং সরঞ্জামসহ বিভিন্ন মালামাল ভাঙচুর করা হয়। কর্মীদের কয়েকজন আতঙ্কে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ঘটনার পর সালমান মুক্তাদির নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ক্ষতিগ্রস্ত স্টুডিওর ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, তার স্টুডিও পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। পরে দেওয়া ভিডিও বক্তব্যে তিনি বলেন, হামলার মূল লক্ষ্য হয়তো তিনি ছিলেন না; বরং স্টুডিও যে ভবনে অবস্থিত, সেই সম্পত্তির মালিকের সঙ্গে হামলাকারীদের কোনো বিরোধ থাকতে পারে।
সালমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বাড়ির মালিক বা জমির মালিকের সঙ্গে বিরোধের কারণে হামলা হয়ে থাকতে পারে। তিনি ধারণা প্রকাশ করেন, ওই বিরোধের প্রতিশোধমূলক হামলার মধ্যে তার স্টুডিওও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্য একটি ভিডিওতেও তিনি একই ধরনের বক্তব্য দেন। ফলে তার বক্তব্যের একটি অংশে সরাসরি তার নিজের ওপর চাঁদা দাবির অভিযোগের পাশাপাশি সম্পত্তির মালিককে ঘিরে বিরোধের বিষয়টিও উঠে আসে।
তবে হামলার পর সালমান মুক্তাদির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটিকে চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত করে অভিযোগ তোলেন এবং স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন। তার অভিযোগের বিষয়ে বিএনপির সংশ্লিষ্ট কোনো নেতার বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। পুলিশও এখন পর্যন্ত বিএনপিকে হামলার জন্য দায়ী করে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।
ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিক তদন্তে প্রায় ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে নিউ গিনি প্রপার্টিজ ও অবসরপ্রাপ্ত এক সামরিক কর্মকর্তার সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের বেলায় একটি পক্ষ ওই জমির দখল নিতে গেলে সেখানে থাকা বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালানো হয়। সেই স্থাপনাগুলোর একটি ছিল সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসা এবং দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের কথাও তিনি জানিয়েছেন। বিস্তারিত তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার পুরো চিত্র বের করা হবে বলেও জানান তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ক্যান্টনমেন্ট জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার নাজমুল হকও জানান, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে জমি নিয়ে বিরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে মনে হচ্ছে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, বিরোধে থাকা একটি পক্ষ জমিতে প্রবেশ করতে না পেরে লোকজন নিয়ে সেখানে যায়। ওই সময় সালমানের স্টুডিও মাঝখানে পড়ে যায় এবং হামলাকারীরা সেটি সালমানের স্টুডিও—এ বিষয়টি জানত কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পুলিশ বলেছে, স্টুডিওটি হামলার মূল লক্ষ্য ছিল না।
ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনও বলেন, নিউ গিনি প্রপার্টিজ ও অবসরপ্রাপ্ত এক সাবেক সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে জমি নিয়ে বিরোধের জেরেই ভবনটিতে হামলা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। সালমান মুক্তাদির নিউ গিনি প্রপার্টিজের কাছ থেকে একটি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে সেখানে স্টুডিও পরিচালনা করতেন এবং সেই স্টুডিওও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়নি যাতে সালমান মুক্তাদিরের কাছে সরাসরি চাঁদা দাবি করা হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, সালমান যদি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে মামলা করেন, তাহলে সেটিও তদন্ত করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর ক্ষোভ প্রকাশ করেন সালমান মুক্তাদির। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ভিডিও বার্তায় তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি ঘটনা নিয়ে মামলা বা আইনগত প্রক্রিয়া চলার পরও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত না থাকেন, তাহলে মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারের অবস্থান কী—এ নিয়ে। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে সাধারণ মানুষের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত হিসেবেও তুলে ধরেন।
এ নিয়ে পাল্টা বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালমানের অভিযোগকে ‘ঢালাও’ বা নির্দিষ্ট ভিত্তিহীন অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে সামগ্রিকভাবে অভিযুক্ত না করে নির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে মামলার বিষয়েও দিনের বিভিন্ন সময়ে তথ্যের পরিবর্তন দেখা গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ২৭ সেপ্টেম্বরের বক্তব্যের সময় পর্যন্ত তিনি বলেছিলেন, সালমান মুক্তাদির নিজে স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা করেননি। কিন্তু পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রায় ২০০ জনকে আসামি করে মামলা হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ফলে মামলাটি কখন এবং কার পক্ষ থেকে করা হয়েছে, আসামিদের পরিচয় কী এবং মামলায় কী কী অভিযোগ আনা হয়েছে—এসব বিষয় তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে আরও পরিষ্কার হওয়ার কথা।
হামলার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে কয়েকজনের বক্তব্যও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের দিকে বিপুলসংখ্যক লোক সেখানে প্রবেশ করে ভাঙচুর শুরু করে। হামলাকারীদের কারও কারও হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। স্টুডিওর কর্মীরা আতঙ্কে আশ্রয় নিলে তাদের ভয় দেখানো এবং ব্যক্তিগত মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও এসেছে। এসব অভিযোগের সবগুলো এখনো তদন্তের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
হামলায় স্টুডিওর মূল্যবান উৎপাদন সরঞ্জামের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লায়েন্টের কাজ ও ফুটেজ ক্ষতিগ্রস্ত বা খোয়া যাওয়ার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন সালমান। তিনি জানান, স্টুডিওতে বহু ক্লায়েন্টের কাজ সংরক্ষিত ছিল এবং ক্ষতির পূর্ণ হিসাব তাৎক্ষণিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পর সালমান মুক্তাদির বলেন, স্টুডিও ধ্বংস হলেও তিনি কাজ বন্ধ করবেন না এবং আরও বড় পরিসরে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি দেশের তরুণ উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট নির্মাতাদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
ঘটনাটি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন রাজধানীতে একই সময়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও জমি দখলের চেষ্টার একাধিক অভিযোগ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলছে। সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও হামলার পাশাপাশি রাজধানীর অন্য কয়েকটি ঘটনাও সরকারের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এ ঘটনায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও এবং মিরপুরের রাড্ডা টিকাকেন্দ্রে হামলাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে জড়িতদের, এমনকি নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে চূড়ান্ত তদন্ত ও মামলার অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করবে হামলার প্রকৃত কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং চাঁদাবাজির অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে পরবর্তী সিদ্ধান্ত।
সূত্রঃ স্যোশাল মিডিয়া
এমকে

