14.1 C
London
June 6, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

অভিবাসন নীতির অনিশ্চয়তায় ব্রিটিশ নাগরিকত্বের পথে অভিবাসীরা

যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতি নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিতর্ক ও সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অনেক দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসী নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব অর্জনের দিকে ঝুঁকছেন। এমনই একজন ৩০ বছর বয়সী ক্রিস্টিনা, যিনি শৈশবে ফিলিপাইন থেকে যুক্তরাজ্যে এসে প্রায় দুই দশক ধরে দেশটিতে বসবাস করলেও সম্প্রতি নাগরিকত্ব পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

শ্রপশায়ারের এক গ্রামের বাসিন্দা ক্রিস্টিনা ২০০৮ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে ইংল্যান্ডে আসেন। বর্তমানে তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পরিবারের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করেন এবং একই সঙ্গে নতুন অভিবাসীদের ইংরেজি ভাষা শিক্ষা দেন। ইতোমধ্যে তিনি ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (আইএলআর) বা স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেয়েছেন। তবুও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাকে ব্রিটিশ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার বিষয়ে আরও আগ্রহী করে তুলেছে।

ক্রিস্টিনার মতে, যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য ও নীতিগত প্রস্তাবনা অনেক অভিবাসীর মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তিনি বলেন, “আমি ছোটবেলা থেকে এখানে আছি, কিন্তু তারপরও মনে হয় ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমাকে নিজের ভবিষ্যৎ আরও নিরাপদ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিয়েছে।”

বর্তমান লেবার সরকার স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে দশ বছর করার প্রস্তাব দিয়েছে। যদিও দলটির ভেতর থেকেই এ প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি উঠেছে, তবুও বিষয়টি অভিবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, রিফর্ম ইউকে দল অতীতে আইএলআর ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বাতিল করে অভিবাসীদের নিয়মিত বিরতিতে কঠোর শর্তে ভিসা নবায়নের আওতায় আনার প্রস্তাব দিয়েছিল।

যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীদের জন্য ‘লাইফ ইন দ্য ইউকে’ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। ২৪টি প্রশ্নের এই পরীক্ষায় ব্রিটিশ ইতিহাস, আইন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কিত জ্ঞান যাচাই করা হয়। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে অন্তত ১৮টি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে হয়।

ক্রিস্টিনা জানান, পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় তাকে এমন প্রশ্ন পড়তে হয়েছে, যেমন ১৬৪৯ সালে কোন রাজাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল কিংবা স্কটল্যান্ডের বিখ্যাত লখ লোমন্ড কোথায় অবস্থিত। তবে তিনি মনে করেন, ব্রিটিশ সমাজে কার্যকরভাবে বসবাসের জন্য সরকারব্যবস্থা, নাগরিক অধিকার, আইন ও সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে জ্ঞান বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, “ব্রিটিশ মূল্যবোধ, আইন এবং সরকার কীভাবে পরিচালিত হয়, সেসব জানা মানুষের জন্য বেশি প্রয়োজনীয়। অতীতের রাজা-রানিদের সম্পর্কে জানা ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও দৈনন্দিন জীবনের জন্য সব সময় সমানভাবে প্রাসঙ্গিক নয়।”

২০১৮ সালে হাউস অব লর্ডসের একটি কমিটিও লাইফ ইন দ্য ইউকে পরীক্ষার সমালোচনা করে বলেছিল, এতে ব্যবহারিক নাগরিক জ্ঞানের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত অপ্রয়োজনীয় ঐতিহাসিক তথ্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে সমালোচনা সত্ত্বেও ক্রিস্টিনা মনে করেন, নাগরিকত্বের এই যাত্রা তাকে নিজের পরিচয় সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করেছে। তিনি বলেন, “কোনো দেশের সংস্কৃতি জানতে হলে সেই সমাজের মধ্যে থাকতে হয়, মানুষের সঙ্গে মিশতে হয় এবং তাদের জীবনধারা বুঝতে হয়। আমি নিজেকে ইংরেজ মনে করি, কিন্তু একই সঙ্গে আমি আমার ফিলিপিনো পরিচয় নিয়েও গর্বিত।”

এদিকে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, বর্তমান পরীক্ষাটি নাগরিকত্ব, একীভূতকরণ ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি ব্রিটিশ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে। পাশাপাশি সরকারের নতুন অভিবাসন শ্বেতপত্রে পরীক্ষার বিষয়বস্তু ও পরিচালনা পদ্ধতি হালনাগাদের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন নীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক যত তীব্র হবে, ততই দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত অনেক অভিবাসী নিজেদের অবস্থান আরও স্থায়ী ও সুরক্ষিত করতে ব্রিটিশ নাগরিকত্বের দিকে ঝুঁকতে পারেন।

সূত্রঃ বিবিসি

এম.কে

আরো পড়ুন

স্কটল্যান্ডে স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণে বাড়লো এলকোহলের দাম

প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সক্রিয় টোরি এমপি

যুক্তরাজ্যে বন্ধ হতে যাচ্ছে সিগন্যালের কার্যক্রম