আর্জেন্টিনা ও মিশরের বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচকে ‘দিনদুপুরে ডাকাতি’ বলে অভিহিত করেছেন পর্তুগিজ ফুটবল কিংবদন্তি জোসে মরিনহো। তবে কিছু ফুটবল বিশেষজ্ঞ বলছেন, ম্যাচের সিদ্ধান্তগুলো দুই দলের যেকোনো দিকেই যেতে পারতো। আটলান্টায় অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে জয় পায় আর্জেন্টিনা, যা নিয়ে বিশ্বকাপে বৈধতা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ঘিরে বিশ্বকাপের বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই এই নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার শেষ ষোলোর নকআউট ম্যাচে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা মিশরের বিপক্ষে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। ম্যাচে অস্বাভাবিক দেরিতে দেয়া একটি ভিএআর সিদ্ধান্তে মিশরের দ্বিতীয় গোল বাতিল করা হয়। এরপরই একের পর এক ঘটনা আর্জেন্টিনার জয়ের দিকে গড়ায়।
এর আগের দিন ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডজনিত এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা ও বাতিল করতে ফিফাকে অনুরোধ করেছেন। ফিফা বিতর্কিতভাবে সেই অনুরোধ রক্ষা করে। তবে বেলজিয়াম স্বাগতিকদের ৪-১ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দেয়। যে ম্যাচে বালোগানের নিষিদ্ধ থাকার কথা ছিল, সেই ম্যাচে খেলেও কোনো লাভ হয়নি।
ফিফার লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ ফিফা ও ট্রাম্প উভয়ের বিরুদ্ধে থাকলেও, মিশরের ক্ষোভ পুরোপুরি সংস্থাটির বিরুদ্ধে। মিশরের কোচ হুসাম হাসানের দাবি, ফিফা ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রাখতে চেয়েছে।’ তার ধারণা, লিওনেল মেসির মতো বড় নামকে টুর্নামেন্টে ধরে রাখতে ম্যাচ কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।
হাসান ম্যাচ শেষে বিইন স্পোর্টসকে বলেন, ‘সম্ভবত তারা চেয়েছিল মেসি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকুক। ফুটবলে অনেক সময় কারিগরি দিকের বাইরেও বাহ্যিক বিষয় প্রভাব ফেলে। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা প্রতিটি স্তরেই সমর্থন পেয়েছে।’ যদিও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই টুর্নামেন্টের সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা এখন খেলা ও রাজনীতির মধ্যকার সীমারেখা আরও ঝাপসা হয়ে যাওয়ার কথা বলছেন।
সাংহাইয়ের এমলিয়ন বিজনেস স্কুলের আফ্রো-ইউরেশিয়ান স্পোর্টসের অধ্যাপক সাইমন চ্যাডউইক আল জাজিরাকে বলেন, ‘বালোগান কাণ্ডের পর কে জানে কোন সিদ্ধান্তগুলো বৈধ এবং বিশ্বাসযোগ্য, আর কোনগুলো নয়। যদি ট্রাম্প প্রশাসন টুর্নামেন্টের ওপর নজরদারি করে, তাহলে মনে রাখা দরকার যে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই একজন কট্টর ট্রাম্প সমর্থক।’ যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পপন্থি রাজনৈতিক সমাবেশগুলোতে মিলেই নিয়মিত অংশ নেন এবং ট্রাম্প এই কট্টর ডানপন্থি নেতাকে তার ‘প্রিয় প্রেসিডেন্ট’ বলে অভিহিত করেছেন।
চ্যাডউইকের মতে, বিশ্বকাপে ফিলিস্তিনের প্রতি হাসানের সোচ্চার সমর্থনের কারণেও কিছু কর্মকর্তার ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্তর্নিহিত পক্ষপাত’ থাকতে পারে। সোমবারের প্রি-ম্যাচ সংবাদ সম্মেলনের একটি অংশে হাসান ফিলিস্তিনি জনগণ, বিশেষ করে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার মানুষের পক্ষে আবেগঘন বক্তব্য দেন।
মিশরের এগিয়ে থাকার ব্যবধান কমিয়ে দেয়া সেই ভিএআর সিদ্ধান্ত এবং এর পরে আর্জেন্টিনার সুবিধা পাওয়া নিয়ে চ্যাডউইক বলেন, খেলার সেই সময়টুকু ‘অস্বাভাবিক’ ছিল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, রেফারি কেন সরাসরি ফাউলের বাঁশি বাজাননি, যা কয়েক মুহূর্ত পরে এবং মিশর দ্বিতীয় গোল করার পরই ভিএআরে ধরা পড়ল।
চ্যাডউইক বলেন, ‘গোল ও ভিএআর সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্পষ্টতই কিছু অস্বাভাবিক ছিল। আর্জেন্টিনা যখন একটি গোল করল তখন সেটি আরও প্রকট হয়ে উঠল। এর আগে আর্জেন্টিনার এক খেলোয়াড় একই ধরনের অপরাধ করেছিলেন, যা মিশরীয় খেলোয়াড়ের কথিত অপরাধের মতোই ছিল। অন্তত ম্যাচে রেফারিং মান কিছুটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক ভাষ্যকার ও ফুটবল বিশেষজ্ঞ যখন সিদ্ধান্তগুলোয় ক্ষুব্ধ, তখন কিছু ফুটবল বিশেষজ্ঞ ভিন্নমত পোষণ করেছেন। ফুটবল বিশ্লেষক আলি আল-গারনি বলেন, ‘ডাকাতি হয়তো কঠিন শব্দ হয়ে যায়। আমি বলব রেফারি ও ভিএআরের সিদ্ধান্তগুলো যেকোনো দিকেই যেতে পারত, আর্জেন্টিনা সব ফিফটি-ফিফটি সিদ্ধান্তে সুবিধা পেয়েছে।’ ইউরোপীয় ও উত্তর আফ্রিকার ফুটবল নিয়ে ব্যাপক প্রতিবেদন করা এই বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘মিশরের বাতিল হওয়া গোলের আগের ঘটনাটি অনস্বীকার্যভাবে ফাউল ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি গোলের বৈধতা যাচাই করতে ভিএআর কতটা পিছিয়ে যেতে পারবে।’
সূত্রঃ আল জাজিরা
এম.কে

