ব্রেক্সিটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে জোরদার করতে একাধিক চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে ব্রিটেন। এর অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদ্যুৎ বাজারে পুনরায় যুক্ত হতে জোটটির দরিদ্র সদস্য দেশগুলোর উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে ব্রিটিশ সরকার। বিনিময়ে ব্রিটিশ জ্বালানি কোম্পানিগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ বাজারে অবাধে ব্যবসা করার সুযোগ পাবে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের হাতে আসা একটি খসড়া চুক্তির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ব্রিটিশ করদাতাদের অর্থ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র সদস্য দেশগুলোতে সড়ক, বিমানবন্দর এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণের মতো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা হবে।
খসড়া যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ বাজারের নির্দিষ্ট কিছু অংশে যুক্ত হওয়ার বিনিময়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য কমাতে উপযুক্ত আর্থিক অবদান রাখতে হবে ব্রিটেনকে। তবে কোন দেশ কত অর্থ পাবে, সে বিষয়ে এখনো সদস্য দেশগুলোকে নির্দিষ্ট কোনো হিসাব জানানো হয়নি।
চলতি মাসের শেষ দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের একটি শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ব্রেক্সিট-পরবর্তী সম্পর্ক পুনর্গঠনের লক্ষ্যে কয়েকটি পৃথক চুক্তি চূড়ান্ত করার ঘোষণা আসতে পারে।
নতুন সমঝোতার আওতায় খাদ্য নিরাপত্তা ও কার্বন নিঃসরণসংক্রান্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়মের সঙ্গে নিজেদের আইন সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সম্মত হয়েছে ব্রিটেন। এর ফলে ইউরোপের সঙ্গে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে কাগজপত্রের জটিলতা কমবে এবং কিছু পণ্যের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক এড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে এর জন্য ব্রিটেনকে ব্রাসেলসে প্রণীত শত শত বিধিবিধানের সঙ্গে নিজেদের আইন সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। পাশাপাশি লুক্সেমবার্গভিত্তিক ইউরোপীয় বিচার আদালতের এখতিয়ারও মেনে নিতে হতে পারে। নতুন নিয়ম প্রণয়নের ক্ষেত্রে ব্রিটেনের সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা না থাকলেও ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবর্তিত বিধিবিধানের সঙ্গে দেশটিকে নিজেদের আইন হালনাগাদ করতে হবে।
খাদ্য নিরাপত্তা চুক্তি কার্যকর হলে গ্রেট ব্রিটেন, ক্রাউন ডিপেনডেন্সিজ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে অধিকাংশ প্রাণী, প্রাণিজ পণ্য, উদ্ভিদ ও উদ্ভিদজাত পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রয়োজনীয় সনদ ও সীমান্ত পরীক্ষা তুলে নেওয়া সম্ভব হবে।
এ ছাড়া কার্বন নিঃসরণসংক্রান্ত চুক্তির আওতায় ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বাজারের অনুমতিপত্র পরস্পরের কাছে স্বীকৃতি পাবে। এর ফলে উভয় পক্ষের পণ্যের ওপর কার্বন সীমান্ত সমন্বয় ব্যবস্থার আওতায় আরোপিত শুল্ক থেকেও ছাড় পাওয়া যেতে পারে।
তরুণদের জন্য আলাদা একটি চলাচল চুক্তির পরিকল্পনাও রয়েছে। এর আওতায় ইউরোপীয় নাগরিকরা ব্রিটেনে এবং ব্রিটিশ তরুণরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কাজ, পড়াশোনা, স্বেচ্ছাসেবা কিংবা ভ্রমণের সুযোগ পেতে পারেন।
চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর শুল্কের ক্ষেত্রেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার প্রতিশ্রুতি দিতে যাচ্ছে ব্রিটেন। বর্তমানে চীনা গাড়ির ওপর ব্রিটেনের শুল্ক ১০ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে গেলে তা ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে ব্রিটেনে চীনা গাড়ির দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।
তবে খসড়া চুক্তিতে ব্রিটিশ সরবরাহব্যবস্থার ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের নেতিবাচক প্রভাব কমানোর প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। পারস্পরিক স্বার্থ বিবেচনায় দুই পক্ষ নিজেদের সরবরাহব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি কমানোর বিষয়েও আগামী মে মাসের মধ্যে একটি চুক্তি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। বর্তমানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরে প্রায় ৩৮ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত ফি নেওয়া হয়। প্রস্তাবিত পরিবর্তনে তা যুক্তরাজ্যের স্থানীয় শিক্ষার্থীদের সমপর্যায়ে, অর্থাৎ প্রায় ৯ হাজার ৫৩৫ পাউন্ডে নামিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বছরে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় হতে পারে বলে কিছু পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের বিনিময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্রিটেনের কাছে বিদেশি অপরাধীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা বাতিলের দাবি জানিয়েছে। ব্রিটেনের ২০২৬ সালের সাজা আইনের আওতায় ১২ মাসের বেশি কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বিদেশি অপরাধীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের দাবি, এ পদক্ষেপ ব্রেক্সিট-পরবর্তী প্রত্যাহার চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করতে পারে।
খসড়া বিবৃতিতে ব্রিটেন ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের এ ধরনের আগাম প্রত্যর্পণ ও বহিষ্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার দপ্তর জানিয়েছে, এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের আলোচনার একটি অবস্থান মাত্র; এখনো চূড়ান্তভাবে সম্মত হয়নি সরকার।
ব্রিটিশ সরকারের এক মুখপাত্র বলেছেন, চলমান আলোচনা বা ফাঁস হওয়া নথি নিয়ে তারা মন্তব্য করবেন না। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে ব্রিটিশ অর্থনীতি শক্তিশালী করা, শিল্প খাত সুরক্ষিত রাখা এবং তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এমকে

