ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে নতুন ভেটেরিনারি ও বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনায় অবৈধ কুকুরছানা পাচারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যুক্তরাজ্যে। প্রাণীকল্যাণ সংস্থা, বিশেষজ্ঞ এবং সরকারি সূত্রগুলো সতর্ক করে বলছে, ব্রেক্সিট-পরবর্তী কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হলে পূর্ব ইউরোপভিত্তিক অপরাধচক্র আবারও জাল ‘পেট পাসপোর্ট’ ব্যবহার করে হাজার হাজার কুকুরছানা যুক্তরাজ্যে পাচার করতে পারে।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী, একটি গাড়িতে সর্বোচ্চ পাঁচটি এবং পায়ে হেঁটে বা বিমানে ভ্রমণকারী একজন যাত্রী সর্বোচ্চ তিনটি কুকুর, বিড়াল বা ফেরেট দেশে আনতে পারেন। এই সীমাবদ্ধতা মূলত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রাণী পাচার রোধ এবং প্রাণীকল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর করা হয়েছে।
কিন্তু ইইউর সঙ্গে চলমান ‘স্যানিটারি অ্যান্ড ফাইটোস্যানিটারি (SPS)’ চুক্তির আলোচনায় এই বিধিনিষেধের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্যার কিয়ার স্টারমারের প্রস্তাবিত ‘ব্রেক্সিট রিসেট’ পরিকল্পনার আওতায় যুক্তরাজ্য আবারও ইইউর প্রাণী ও উদ্ভিদ স্বাস্থ্যবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। এর ফলে দেশটি পুনরায় ইইউর ‘পেট পাসপোর্ট’ ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রেক্সিটের আগে এই পেট পাসপোর্ট ব্যবস্থার অপব্যবহার করে পূর্ব ইউরোপের অপরাধচক্র অসংখ্য অসুস্থ ও অমানবিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা কুকুরছানা যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসত। অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু পশুচিকিৎসক যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই ভুয়া নথিতে স্বাক্ষর করতেন, যা পাচারকারীদের কাজ সহজ করে দিত।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, ব্রিটিশ আলোচকরা বর্তমান সীমা—এক ব্যক্তি বা এক গাড়িতে সর্বোচ্চ তিন বা পাঁচটি প্রাণী আনার বিধান—অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করছেন। তাদের মতে, সীমিত সংখ্যক প্রাণী আনা বৈধ প্রজননকারীদের কার্যক্রম নির্দেশ করে। বিপরীতে বেশি সংখ্যক প্রাণী একসঙ্গে প্রবেশের সুযোগ থাকলে সেটি বাণিজ্যিক পাচারের আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
ইইউর পেট পাসপোর্ট ব্যবস্থা প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত এক সাবেক কর্মকর্তা বলেছেন, এই ব্যবস্থাটি দীর্ঘদিন ধরেই সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের অপব্যবহারের শিকার হয়েছে এবং এতে বড় ধরনের ফাঁকফোকর ছিল।
প্রাণীকল্যাণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত তথাকথিত ‘পাপি ফার্ম’ এখন বিলিয়ন ইউরোর একটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এসব খামারে প্রজননের জন্য ব্যবহৃত কুকুরগুলোকে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও নিষ্ঠুর পরিবেশে রাখা হয় এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও পরিচর্যা থেকে বঞ্চিত করা হয়।
আন্তর্জাতিক প্রাণীকল্যাণ সংস্থা Four Paws-এর তথ্য বলছে, ইউরোপে প্রতি বছর প্রয়োজনীয় প্রায় ৬০ লাখ কুকুরছানার মধ্যে ২১ শতাংশ আসে অবৈধ বা সন্দেহজনক প্রজননকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে।
যুক্তরাজ্যের প্রাণীকল্যাণ সংস্থা RSPCA বলেছে, গত বছর কার্যকর হওয়া Puppy Imports Act অবৈধভাবে কুকুরছানা আমদানি বন্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের প্রধান ডেভিড বাউলস বলেন, ইইউও সম্প্রতি একই ধরনের আইন করেছে। তাই উভয় পক্ষের উচিত এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানো, যা অবৈধ কুকুর পাচার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে সহায়তা করবে।
অন্যদিকে Dogs Trust-এর সিনিয়র পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা জশ হিথ বলেছেন, তারা নীতিগতভাবে ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতাকে সমর্থন করলেও সেটি যেন Animal Welfare Act 2025-এর মাধ্যমে অর্জিত প্রাণী সুরক্ষার বিধানকে দুর্বল না করে।
তিনি জানান, দীর্ঘ এক দশকের প্রচারণার পর এই আইনের মাধ্যমে কুকুর পাচারকারীদের অন্যতম বড় সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যে কুকুরছানা আমদানির সর্বনিম্ন বয়স ১৫ সপ্তাহ থেকে বাড়িয়ে ছয় মাস নির্ধারণ করা হয়েছে, ফলে সীমান্তে তাদের বয়স ও স্বাস্থ্য যাচাই আরও সহজ হয়েছে।
জশ হিথ সতর্ক করে বলেন, যদি নতুন চুক্তির কারণে এসব সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে অবৈধ কুকুর পাচারের পথ আবারও খুলে যাবে এবং প্রাণীকল্যাণ রক্ষায় বহু বছরের প্রচেষ্টা ভেস্তে যেতে পারে।
এদিকে স্যার কিয়ার স্টারমার জুলাই মাসে ইইউর সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করতে চাইলেও তার পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কারণে নির্ধারিত শীর্ষ বৈঠক স্থগিত হয়েছে। তবে উভয় পক্ষের কর্মকর্তারা কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্যের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ইইউর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সহজ করা এবং একই সঙ্গে ব্রেক্সিট-পরবর্তী প্রাণীকল্যাণ ও সীমান্ত নিরাপত্তার কঠোর মানদণ্ড অক্ষুণ্ন রাখা। কারণ সামান্য নীতিগত শিথিলতাও সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে এবং অবৈধ কুকুর পাচারের পুরোনো সংকট আবারও ফিরে আসতে পারে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

