TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ইমিগ্র্যান্ট সংখ্যা কমছে, তবু ব্রিটেনে অভিবাসন ইস্যু এখনো রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু

যুক্তরাজ্যে অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও দেশটির সাধারণ মানুষের বড় অংশ এখনো মনে করেন ইমিগ্র্যান্ট আগের চেয়ে বেড়েছে। সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান ও জনমত জরিপে উঠে এসেছে বাস্তবতা এবং জনধারণার মধ্যে বড় ধরনের বৈপরীত্য।

যুক্তরাজ্যের জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর (ওএনএস) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে দীর্ঘমেয়াদি থাকার জন্য দেওয়া ভিসার সংখ্যা ৮ লাখ ৭৫ হাজার থেকে কমে ৭ লাখ ৭৯ হাজারে নেমে এসেছে।

তবে সরকারি এই তথ্যের বিপরীতে জনমত ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। ওয়ানপোলের এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক মনে করেন গত ১২ মাসে যুক্তরাজ্যে অভিবাসীর সংখ্যা বেড়েছে। এছাড়া প্রায় অর্ধেক মানুষ ধারণা করছেন, আগামী বছরেও অভিবাসন আরও বাড়বে।

অভিবাসন এখন ব্রিটিশ রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি ও জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার চেয়েও অভিবাসন ইস্যুকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন ভোটাররা।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈপরীত্যের পেছনে রয়েছে ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ের অভিবাসন পরিস্থিতি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সরকার পয়েন্টভিত্তিক নতুন অভিবাসন ব্যবস্থা চালুর পর যুক্তরাজ্যে অভিবাসীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যায়। এই সময়কে রাজনৈতিকভাবে “বরিসওয়েভ” নামে উল্লেখ করা হয়।

যদিও পরবর্তীতে নেট মাইগ্রেশন দ্রুত কমে আসে, সেই পরিবর্তন জনমনে ততটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে ছোট নৌকায় আশ্রয়প্রার্থীদের প্রবেশের ঘটনা গণমাধ্যমে বেশি গুরুত্ব পাওয়ায় মানুষের মনে অভিবাসন সংকটের ধারণা আরও শক্তিশালী হয়েছে।

ইপসোসের গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ ব্রিটিশ নাগরিক “অভিবাসী” বলতে মূলত আশ্রয়প্রার্থীদের বোঝেন। অথচ বাস্তবে কাজ, শিক্ষা ও পারিবারিক ভিসায় যুক্তরাজ্যে আসা মানুষের সংখ্যা আশ্রয়প্রার্থীদের তুলনায় অনেক বেশি।

মার্চ পর্যন্ত এক বছরে প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার মানুষ কাজ, পড়াশোনা বা পারিবারিক কারণে যুক্তরাজ্যে এসেছেন। একই সময়ে আশ্রয় আবেদন করেছেন প্রায় ৯৪ হাজার মানুষ।

ইপসোসের গবেষণা পরিচালক অ্যালেক্স বোগদান বলেন, সাধারণ মানুষ দক্ষ কর্মী ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা অভিবাসীদের ইতিবাচকভাবে দেখলেও আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে সন্দেহ ও নেতিবাচক মনোভাব বেশি কাজ করে। এই মনোভাব সামগ্রিক অভিবাসন ধারণাকেও প্রভাবিত করছে।

অভিবাসন আরও কমাতে ইতোমধ্যে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাজ্যের সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ভিসা ও স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার নিয়ম কঠোর করেছেন। পাশাপাশি স্থায়ী শরণার্থী মর্যাদার অধিকার বাতিল করে প্রতি ৩০ মাস পরপর আশ্রয় দাবির পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

নতুন নীতিমালার আওতায় নিজ দেশ নিরাপদ বিবেচিত হলে আশ্রয়প্রার্থীদের ফেরত পাঠানোর কথাও বলা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত লেবার পার্টির ভেতরেও বিতর্ক তৈরি করেছে।

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাজ্যের নেট মাইগ্রেশন সর্বোচ্চ ৯ লাখ ৪৪ হাজারে পৌঁছেছিল। তবে সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই সংখ্যা কমে ১ লাখ ৭১ হাজারে নেমে এসেছে, যা প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস।

শাবানা মাহমুদ বলেছেন, যারা যুক্তরাজ্যে অবদান রাখতে চান এবং ভালো জীবন গড়তে চান, তাদের স্বাগত জানানো হবে। তবে সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সরকারের অগ্রাধিকার।

তিনি আরও জানান, সরকার এমন একটি দক্ষতাভিত্তিক অভিবাসন ব্যবস্থা চালু করছে, যা বিদেশি স্বল্পমূল্যের শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমাবে।

এদিকে নাইজেল ফারাজের দল রিফর্ম ইউকে ছোট নৌকায় অভিবাসন ইস্যুকে কেন্দ্র করে জনসমর্থন বাড়াচ্ছে। দলটি বর্তমানে যুক্তরাজ্যের অন্যতম বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ফ্রান্স থেকে ছোট নৌকায় করে ৮ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করেছেন। যদিও এই সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৭ শতাংশ কম।

প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের সরকার মানবপাচারকারী চক্র ভেঙে দিয়ে এই নৌপথে অভিবাসন বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

সূত্রঃ মেট্রো

এম.কে

আরো পড়ুন

বাসস্থান সংকট ও নিম্নমানের বাসস্থান নিয়ে চরম বিপাকে যুক্তরাজ্য সরকার

যুক্তরাজ্যে বক্সিং ডে সেলে বড় ব্র্যান্ডের বড় ছাড়, কোথায় কী সবচেয়ে লাভজনক

গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ, তবুও চালু হচ্ছে যুক্তরাজ্যের ডিজিটাল ‘ভেটেরান কার্ড