কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপক্ষ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করলে ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নেয় এবং পলাতক আট আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। একই সঙ্গে অন্য মামলায় আটক থাকা তিন আসামিকে পরবর্তী শুনানিতে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৫ আগস্ট ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
শেখ হাসিনা ছাড়াও অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক সংসদ সদস্য বদিউর রহমান বদি, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ, কর্নেল (অব.) আনোয়ার লতিফ খান তুষার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম মিনু, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ, মেজর (অব.) রুহুল আমিন ওরফে রাজন, স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস মাহমুদ ওরফে রাজু এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশিকুর রহমান ওরফে সৈকত।
অভিযুক্তদের মধ্যে বদিউর রহমান বদি, আনোয়ার লতিফ খান তুষার এবং মাহবুব আলম মিনু বর্তমানে অন্য মামলায় আটক রয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল তাদের এ মামলায়ও হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন।
শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদনে একরামুল হক হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রপক্ষ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে এবং ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নিয়েছেন।
তিনি বলেন, আটক থাকা আসামিদের এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর আরও দাবি করেন, তৎকালীন সংসদ সদস্য বদিউর রহমান বদির পরিকল্পনাতেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। তার ভাষায়, একরামুল হক ছিলেন বদির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং হত্যাকাণ্ডের পর একরামের সম্পত্তি বিভিন্ন কৌশলে আত্মসাৎ করা হয়। তিনি বদিকে এ ঘটনার “নেপথ্যের মূল পরিকল্পনাকারী” বলে উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, একরাম হত্যা ছিল তৎকালীন সরকারের বিরোধীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত দমন-পীড়নের একটি উদাহরণ। আমিনুল ইসলাম বলেন, সরকারবিরোধী অবস্থানে গেলেই কাউকে গুম, কাউকে গোপন আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া কিংবা কথিত ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। একরামুল হক হত্যাকাণ্ডও সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তিনি জানান, মোবাইল ফোন চালু থাকা অবস্থায় একরামুল হকের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা গুলির শব্দ এবং ঘটনাস্থলের কথোপকথন শুনতে পেয়েছিলেন। সেই অডিও রেকর্ড, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং অন্যান্য আলামতের ভিত্তিতে “সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি” নীতিতে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান কামাল, ওবায়দুল কাদের ও বদিউর রহমান বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার তদন্তে যুক্ত ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা জানিয়েছেন, তদন্ত সংস্থা অডিও রেকর্ড প্রযুক্তিগতভাবে বিশ্লেষণ করে কয়েকজন কর্মকর্তার কণ্ঠ শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া অভিযানে অংশ নেওয়া এক প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষ্য দিয়েছেন, যিনি ওই অভিযানে ব্যবহৃত গাড়িতে উপস্থিত ছিলেন। তার সাক্ষ্য এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযানে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
২০১৮ সালের ২৬ মে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের নোয়াখালিয়া এলাকায় র্যাবের কথিত মাদকবিরোধী অভিযানে একরামুল হক নিহত হন। সে সময় তিনি টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন।
ঘটনার পর তার মোবাইল ফোনে ধারণ হওয়া একটি অডিও রেকর্ড প্রকাশ্যে এলে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ওই অডিওতে একরামুল হকের সঙ্গে তার মেয়ের কথোপকথন, পরে গুলির শব্দ ও গোঙানির আওয়াজ শোনা যায় বলে পরিবারের দাবি ছিল। তার স্ত্রী আয়শা বেগম অভিযোগ করেছিলেন, তার স্বামীকে ডেকে নিয়ে র্যাব ও ডিজিএফআইয়ের সদস্যরা হত্যা করেছেন।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের এপ্রিলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়ের করেন আয়শা বেগম। মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, তৎকালীন সংসদ সদস্য বদিউর রহমান বদির প্রত্যক্ষ ইন্ধনে র্যাব ও ডিজিএফআইয়ের সদস্যরা তার স্বামীকে হত্যা করেন।
এরপর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে অন্য একটি মামলায় আটক থাকা বদিউর রহমান বদিকে এ মামলাতেও গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব ও এর কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সময় একরামুল হক হত্যার ঘটনাও তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই নিষেধাজ্ঞার আওতায় র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদও ছিলেন।
এ মামলার অভিযোগগুলো বর্তমানে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিচারিক প্রক্রিয়াধীন। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি এবং মামলার পরবর্তী কার্যক্রম শেষে ট্রাইব্যুনালের রায়ের মাধ্যমে তাদের আইনগত দায় নির্ধারিত হবে।
সূত্রঃ বিবিসি বাংলা
এম.কে

