ব্রিটেনে দীর্ঘদিন ধরে বহুসাংস্কৃতিক সমাজ ও সহাবস্থানের যে ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছিল, সাম্প্রতিক একের পর এক সহিংস ঘটনা, অভিবাসনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বর্ণবাদী বিদ্বেষের অভিযোগে সেই চিত্র এখন প্রশ্নের মুখে। সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর অনেকেই বলছেন, তারা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অনিরাপদ বোধ করছেন।
এমনকি চার দশক ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক আলি হায়দার নিজের অভিব্যক্তি জানাতে গিয়ে বলেন, “এমন দিন এসেছে এখন যখন নিজের গায়ের চামড়ার রং লুকিয়ে রাখতে পারলে বেঁচে যেতাম বলে মনে হয়।”
সম্প্রতি সাউদাম্পটনে এক ব্রিটিশ-শিখ ব্যক্তির হাতে এক শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযুক্তের সাজা ঘোষণার পর প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, নিহত ব্যক্তির হাতেই হাতকড়া পরাচ্ছে পুলিশ। ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল পুলিশের নীতিমালা পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে বলে, আইন প্রয়োগে জাতিগত পরিচয় নয়, সবার প্রতি সমান আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।
এর মাত্র এক সপ্তাহ পর উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে সুদানি এক অভিবাসীর ছুরিকাঘাতে এক শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি এক চোখের দৃষ্টি হারান। ঘটনার পর মুখোশধারী কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন এলাকায় অভিবাসীদের খুঁজে বেড়ায়। পরবর্তীতে সংখ্যালঘুদের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। অনেক পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডানপন্থি রাজনীতি আরও শক্তিশালী হচ্ছে। অপরাধ, অভিবাসন এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নকে একত্র করে জনমনে ভয় ও বিভাজন তৈরির সুযোগ নিচ্ছে উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলো। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ হিসেবে পরিচিত ব্রিটেনের পরিবেশ ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
পাঁচ বছর বয়সে বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে আসা আলি হায়দার বলেন, এখন শুধু কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায় নয়, ভিন্ন বর্ণের যে কেউ ঝুঁকিতে রয়েছে।
অভিবাসন নিয়ে জনমতের পরিবর্তনের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাইগ্রেশন অবজারভেটরির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০- সালের শুরুতে ব্রিটিশদের অভিবাসন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় ইতিবাচক ছিল। কিন্তু ২০২২ সালের পর থেকে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, সেই মনোভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কঠোর হয়েছে। তরুণ ও বামঘেঁষা ভোটারদের মধ্যে অভিবাসনকে ইতিবাচকভাবে দেখার প্রবণতা বেশি থাকলেও বয়স্ক ও ডানপন্থি সমর্থকদের মধ্যে বিরূপ মনোভাব বাড়ছে।
ব্রিটিশ সোশ্যাল অ্যাটিটিউডস জরিপে দেখা গেছে, উদ্বেগের মূল কেন্দ্র ছোট নৌকায় আসা আশ্রয়প্রার্থীরা। কর্মভিসা বা শিক্ষাভিসায় আগতদের তুলনায় অনিয়মিতভাবে প্রবেশকারীদের নিয়ে জনমনে বেশি অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
বর্ণবাদী আচরণ বৃদ্ধির প্রমাণ মিলছে কর্মক্ষেত্রেও। নীতি বিশেষজ্ঞ ও একাধিক ট্রেড ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন কর্মস্থলে সংখ্যালঘু কর্মীরা আগের তুলনায় বেশি বর্ণবাদী মন্তব্য ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। রয়্যাল কলেজ অব নার্সিং জানিয়েছে, ২০২২ সালের পর থেকে তাদের সদস্যদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ ৫৫ শতাংশ বেড়েছে। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের প্রধান পল রিস বলেছেন, স্বাস্থ্যখাতের এক-তৃতীয়াংশ কর্মী কৃষ্ণাঙ্গ, এশীয় বা অন্যান্য সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর হলেও অনেকেই জানিয়েছেন, কয়েক দশকের মধ্যে এতটা বৈরী আচরণের মুখোমুখি তারা আগে হননি।
প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সব ধরনের বর্ণবাদ ও সহিংসতার নিন্দা জানালেও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা মনে করেন, রাজনৈতিক বক্তব্যের ধরনই সমাজে বিভাজন বাড়িয়ে তুলছে। তাদের মতে, অপরাধের বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে পুরো অভিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা সামাজিক সম্প্রীতিকে দুর্বল করছে।
ডানপন্থি নেতা নাইজেল ফারাজ দাবি করেছেন, ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলো শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে। তবে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এ ধরনের বক্তব্য সমাজে বিভাজন উসকে দেয়।
আলি হায়দার জানান, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে বর্ণবাদ অনেকটাই কমে এসেছিল। তবে ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের সময় অভিবাসন প্রশ্নে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে গণপরিবহনে অপরিচিত মানুষ পর্যন্ত তাকে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড নিয়ে মতামত জানতে চেয়েছেন এবং কেউ কেউ সরাসরি বলেছেন, মুসলমানরা ব্রিটিশ সমাজের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না।
শিখ সম্প্রদায়ও একই ধরনের বিদ্বেষের শিকার হচ্ছে। শিখ সংগঠনের এক নেতা জানান, সামাজিক মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বার্তা এবং ধর্ম বিলুপ্ত করার আহ্বান জানিয়ে ই-মেইল পাঠানো হচ্ছে। তার ভাষায়, এতটা বিষাক্ত পরিবেশ আগে কখনও দেখেননি।
উত্তর আয়ারল্যান্ডে সুদানের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থী তওয়াসুল মোহাম্মদ বলেন, নারী ও শিশুরা আতঙ্কে রয়েছে। সাম্প্রতিক হামলার পর তিনি সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন। তার মতে, ২০২৪ সালের দাঙ্গার পর থেকেই সংখ্যালঘুদের জন্য নর্থ আয়ারল্যান্ডের পরিবেশ ক্রমেই শত্রুভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে।
এর আগে সাউথপোর্টে তিন কিশোরী হত্যার ঘটনায়ও সামাজিক মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ে যে হামলাকারী ছোট নৌকায় আসা এক শরণার্থী। পরে তদন্তে জানা যায়, অভিযুক্ত ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া রুয়ান্ডান বংশোদ্ভূত এক কিশোর, যিনি অপরাধের দায় স্বীকার করেন। তবুও ওই গুজবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে পুলিশের নথিভুক্ত বর্ণবাদপ্রণোদিত ঘৃণামূলক অপরাধ ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে ছয় শতাংশ বেড়ে ৮২ হাজার ৪৯০টিতে পৌঁছেছে।
২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ নিজেদের কৃষ্ণাঙ্গ, এশীয়, মিশ্র বা অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। বহু দশক ধরে ব্রিটেন বিভিন্ন সম্প্রদায়কে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সফল ছিল। এর উদাহরণ হিসেবে দেশটির প্রথম অশ্বেতাঙ্গ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক এবং পরবর্তীতে কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হিসেবে কেমি বেডনোকের উত্থানকে উল্লেখ করা হয়।
তবে অভিবাসন নিয়ে জনমত দ্রুত বদলাচ্ছে। জরিপে দেখা গেছে, যারা মনে করেন অভিবাসন ব্রিটেনের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির জন্য উপকারী, তাদের হার ২০২২ সালের ৫০ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ৩২ শতাংশে।
ব্রেক্সিটের পর শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় ভারত, নাইজেরিয়া ও অন্যান্য দেশ থেকে স্বাস্থ্যকর্মী এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও অভিবাসন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রেই রয়ে গেছে। ২০২৩ সালে নেট অভিবাসন রেকর্ড ৯ লাখ ৪৪ হাজারে পৌঁছালেও কঠোর ভিসা নীতির কারণে ২০২৫ সালে তা কমে ১ লাখ ৭১ হাজারে নেমে আসে। তবুও ছোট নৌকায় আশ্রয়প্রার্থীদের আগমন অব্যাহত থাকায় বিরোধীরা সরকারের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ সতর্ক করে বলেছেন, অতীতের উচ্চ অভিবাসনের চাপ জনসেবার ওপর প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে তিনি আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নতুন আর্থিক নীতির ঘোষণা দিয়েছেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, যাদের সামর্থ্য রয়েছে তাদের কাছ থেকে আবাসন ও মৌলিক জীবনধারণ সহায়তার ব্যয়ের একটি অংশ ছাত্রঋণের আদলে পরিশোধ নেওয়া হবে। সরকারের দাবি, এতে করদাতাদের ওপর চাপ কমবে এবং দরিদ্রদের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা বহাল থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নীতি থেকে খুব বেশি অর্থ আদায় হবে না। কারণ আশ্রয় পাওয়ার পাঁচ বছর পরও অধিকাংশ শরণার্থীর আয় তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক মেরুকরণ, অভিবাসন নিয়ে তীব্র বিতর্ক, সামাজিক মাধ্যমে ঘৃণামূলক প্রচারণা এবং বিচ্ছিন্ন সহিংস ঘটনাগুলো মিলিয়ে ব্রিটেনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে বহু বছর ধরে গড়ে ওঠা সামাজিক সম্প্রীতি আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান \ রয়টার্স \ ইনফো মাইগ্র্যান্টস
এম.কে

