TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেড় লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাঃ শিল্পায়নে নতুন গতি পাচ্ছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে নতুন শিল্পায়ন ও বৈদেশিক বিনিয়োগের অন্যতম বড় সম্ভাবনা হিসেবে সামনে এসেছে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল। প্রায় এক দশকের দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও নীতিগত স্থবিরতা কাটিয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারা এবং বাগেরহাটের মোংলাকে কেন্দ্র করে দুটি বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক এবং বিনিয়োগ আগ্রহের ঘোষণার ফলে প্রকল্পগুলো নতুন গতি পেয়েছে।

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, আনোয়ারা চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে প্রায় এক লাখ এবং মোংলা পোর্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলে আরও প্রায় ৫০ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় দেড় লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি পরিবহন, নির্মাণ, গুদামজাতকরণ, ব্যাংকিং, বীমা, আবাসন, খাদ্য সরবরাহ, লজিস্টিকস এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন সহায়ক খাতে আরও কয়েক লাখ মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও পর্যাপ্ত শিল্প বিনিয়োগের অভাবে কর্মসংস্থান প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। এ বাস্তবতায় নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো শুধু শিল্প অবকাঠামো নয়, বরং কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শুরু হয় ২০১৪ সালে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ও চীনের সরকার-টু-সরকার ভিত্তিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হলেও ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন, নকশা পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক জটিলতায় প্রকল্পটি দীর্ঘদিন স্থবির ছিল। পরবর্তীতে নতুন বাস্তবায়ন কাঠামো গ্রহণের মাধ্যমে আবারও প্রকল্পটি সচল হয়।

সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি আনোয়ারা প্রকল্পের সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা সহজ শর্তের ঋণ হিসেবে দেবে চীন সরকার এবং অবশিষ্ট অর্থ বহন করবে বাংলাদেশ সরকার।

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার প্রায় ৮০০ একর জমিতে গড়ে উঠতে যাওয়া এই শিল্পাঞ্চল কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের নিকটবর্তী হওয়ায় কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই শিল্পাঞ্চলে বস্ত্র, তৈরি পোশাক, ওষুধ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, মোবাইল ফোন, জুতা, বৈদ্যুতিক পণ্য, ক্রীড়া সামগ্রী, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং রাসায়নিক শিল্পসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী কারখানা স্থাপন করা হবে। সংশ্লিষ্টদের আশা, পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে এটি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ শিল্প ও কর্মসংস্থান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।

অন্যদিকে বাগেরহাটের মোংলা পোর্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নেও বড় অগ্রগতি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন ৬৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল, বন্ডেড ওয়্যারহাউস এবং আধুনিক লজিস্টিকস হাব নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আরও প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক রপ্তানি, কোল্ড-চেইন, গুদামজাতকরণ ও পরিবহন কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য গতি আসবে।

চীন সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে গ্যাস অনুসন্ধান, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, স্মার্ট মিটার, ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, কোল্ড-চেইন, বস্ত্রশিল্প, লিথিয়াম ব্যাটারি, রেলওয়ের যন্ত্রাংশ, কারিগরি শিক্ষা, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভেষজ শিল্পসহ ১১টি খাতে প্রায় ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে।

এ ছাড়া কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে প্রায় ১৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। একই প্রতিষ্ঠানের মিরসরাই শিল্পাঞ্চলে ইতোমধ্যে প্রায় ১২ হাজার মানুষ কাজ করছেন।

বিশ্বব্যাপী উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অনেক চীনা প্রতিষ্ঠান নতুন উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়, বড় অভ্যন্তরীণ বাজার, সমুদ্রবন্দর, আঞ্চলিক যোগাযোগ সুবিধা এবং রপ্তানি সম্ভাবনার কারণে বাংলাদেশ এখন চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছে ক্রমেই আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার পৃথক অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিনিয়োগ সহায়তা কেন্দ্র এবং চীনা ভাষাভিত্তিক ডিজিটাল সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু সমঝোতা স্মারক বা বিনিয়োগের ঘোষণা যথেষ্ট নয়; নির্ধারিত সময়ে অবকাঠামো নির্মাণ, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, দক্ষ জনবল গড়ে তোলা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখাই হবে প্রকল্পগুলোর সাফল্যের মূল শর্ত। অতীতে দীর্ঘ বিলম্বের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, ঘোষিত বিনিয়োগ বাস্তবে রূপ পেলে আনোয়ারা ও মোংলার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল শুধু দেড় লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করবে না, বরং কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা, রপ্তানি বৈচিত্র্য, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

এম.কে

আরো পড়ুন

বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাত জোরদারে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যৌথ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত

দুই মাস পর ভারতীয়দের বাংলাদেশের ভিসা দেওয়া শুরু

শেখ হাসিনা আমার কথা পাত্তা দেননিঃ সালমান এফ রহমান