ব্রিটেন ইউক্রেনকে আরও দূরপাল্লার স্টর্ম শ্যাডো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাশিয়ার হামলা থেকে ইউক্রেনকে আত্মরক্ষায় সহায়তা এবং শীতের আগে দেশটির সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
দ্য টেলিগ্রাফের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে ডাউনিং স্ট্রিটে দুই নেতার বৈঠকে রাশিয়ার বেসামরিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা এবং ইউক্রেনকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সহায়তা করার বিষয়ে আলোচনা হয়। এর আগে গত শরৎকালেও ইউক্রেনকে স্টর্ম শ্যাডো ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছিল ব্রিটেন। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারে ইউক্রেন।
নিরাপত্তার কারণে ইউক্রেনকে মোট কতটি স্টর্ম শ্যাডো ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশ করে না ব্রিটিশ সরকার। দেশটির প্রতিরক্ষা বিভাগের একটি সূত্র দ্য টেলিগ্রাফকে জানিয়েছে, রাশিয়ার অবৈধ হামলার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের আত্মরক্ষার অধিকারে সহায়তা দিতে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুসরণ করে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখা হচ্ছে। সূত্রটি আরও জানিয়েছে, নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের উদ্দেশ্য ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা।
এদিকে, ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন কমে আসতে পারে—এমন উদ্বেগের মধ্যে বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে বৈঠক করতে ওয়াশিংটন সফর করেন।
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে দেশটি থেকে ডিজেল আমদানির অনুমতি দেওয়া এবং রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করতে ইউক্রেনকে নির্দেশ দেওয়ার ঘটনায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলেছিলেন জেলেনস্কি। তবে বৃহস্পতিবার রাশিয়ার একটি তেল শোধনাগারে ইউক্রেন হামলা চালানোর পর জেলেনস্কি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত জ্বালানি যুদ্ধবিরতি মেনে চলা নিয়ে তিনি আর বাধ্যবাধকতা অনুভব করছেন না। ট্রাম্প ওই হামলাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন তিন দিন যুদ্ধবিরতি মেনে চললেও রাশিয়া দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলা অব্যাহত রেখেছিল। এক সপ্তাহে এসব হামলায় শতাধিক বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বাড়ে, যখন জেলেনস্কি দাবি করেন, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে মিত্রদের কাছ থেকে আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। তবে ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউক্রেনের কর্মকর্তারা দ্য টেলিগ্রাফকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ করেছে—এমন কোনো লক্ষণ তারা দেখেননি।
অন্যদিকে, ইলন মাস্ক ইউক্রেনের ড্রোন ব্যবহারে গতিসীমা আরোপের জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। মার্কিন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন মাস্কের স্টারলিংক প্রযুক্তির সামরিক সংস্করণ স্টারশিল্ড ব্যবহারকারী ইউক্রেনীয় ড্রোনের গতিসীমা ঘণ্টায় ১০০ মাইল নির্ধারণ করেছে পেন্টাগন—এমন খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে স্টারলিংক পরিষেবায় বিধিনিষেধ আরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ওয়াশিংটন। সফরকালে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং।
ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে স্ট্রিটিং সতর্ক করে বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আগ্রাসনকে পুরস্কৃত করা হলে তার পরিণতি শুধু ইউক্রেন বা ইউরোপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তিনি বলেন, ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে হলেও শক্তি প্রয়োগ করে সীমান্ত পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে দর-কষাকষির বিষয় বানানোর সুযোগ দেওয়া হলে তার প্রভাব আরও বিস্তৃত হবে।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ইউক্রেনের পাশে দাঁড়ানো মূল্যবোধ ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার বিষয় নয়; বরং শেষ পর্যন্ত এই দুটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তার মতে, তুলনামূলক কম ব্যয়ের প্রযুক্তিও আধুনিক যুদ্ধের চিত্র বদলে দিতে পারে। সামরিক শক্তির ক্ষেত্রে শুধু ব্যয়বহুল অস্ত্রের মালিক হওয়া নয়, দ্রুত নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং ব্যাপক হারে অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
স্ট্রিটিং বলেন, প্রতিরক্ষা খাতে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করতে পারে। তার মতে, দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চলতি শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও কার্যকর জোট গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করেছে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এমকে

