সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্দেশ্যহীনভাবে সময় কাটানোর প্রবণতা তরুণদের কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অ্যামাজনের যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ড অঞ্চলের প্রধান জন বুমফ্রে। তার মতে, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা তরুণদের বাস্তব কর্মজীবনের জন্য যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশটির অর্থনীতি ও কর্মবাজারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
নর্থ্যাম্পটনশায়ারে অ্যামাজনের নতুন সরবরাহ কেন্দ্র উদ্বোধনকালে দেওয়া বক্তব্যে জন বুমফ্রে বলেন, আজকের তরুণদের মধ্যে দলগতভাবে কাজ করা, কার্যকরভাবে যোগাযোগ করা এবং সমস্যা সমাধানের মতো মৌলিক দক্ষতার ঘাটতি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, “মোবাইল ফোনে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেতিবাচক বা উদ্বেগজনক বিষয়বস্তু দেখে সময় কাটানো কর্মজীবনে কোনো কাজে আসবে না। কর্মক্ষেত্রে সফল হতে হলে মানুষকে অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে, একসঙ্গে কাজ করতে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে জানতে হবে।”
অ্যামাজনের এই শীর্ষ নির্বাহীর মতে, নিয়োগদাতারা এখন শুধু একাডেমিক ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকেন না; বরং কর্মীদের মধ্যে বাস্তব দক্ষতা রয়েছে কি না, সেটিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, “কোনো শিক্ষককে অসম্মান করার উদ্দেশ্যে বলছি না, তবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বহু বছর ধরে একই ধরনের বিষয়বস্তু একই পদ্ধতিতে পড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ নিয়োগদাতা হিসেবে আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই দলগত কাজ, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাকে।”
নিজের পরিবারের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, তার সন্তান বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কিন্তু পাঠ্যক্রমে এমন কোনো বিষয় নেই যেখানে এসব বাস্তব দক্ষতা শেখানো বা মূল্যায়ন করা হয়।
তবে তিনি মনে করেন, শুধুমাত্র শিক্ষা ব্যবস্থাই নয়, অনেক তরুণের মধ্যেও কর্মজীবন সম্পর্কে জানার আগ্রহের অভাব রয়েছে। তার ভাষায়, “সমস্যার বড় অংশ হলো মানুষকে আগ্রহী করে তোলা—যাতে তারা নিজে থেকে এগিয়ে এসে বলতে পারে, ‘আমি আরও জানতে চাই, আমি কাজ করতে চাই।'”
জন বুমফ্রের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাজ্যে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
জাতীয় পরিসংখ্যান কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে দেশটির সামগ্রিক বেকারত্বের হার বেড়ে ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার পৌঁছেছে ১৬ দশমিক ২ শতাংশে, যা ২০১৪ সালের পর সর্বোচ্চ।
অ্যামাজন প্রধান এই পরিস্থিতিকে “জাতীয় সংকট” হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে প্রায় ১০ লাখ তরুণ এমন অবস্থায় রয়েছে, যারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা কোনো প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত নয়।
এদিকে তরুণদের কর্মসংস্থান সংকট পর্যালোচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবেক মন্ত্রী অ্যালান মিলবার্ন সম্প্রতি প্রকাশিত এক অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার তরুণ বেকার হয়ে পড়তে পারেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের পরিচর্যা ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসা অনেক তরুণ কর্মসংস্থানের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব এবং সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে জন বুমফ্রে বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে বাধ্যতামূলক কর্মঅভিজ্ঞতা কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তার মতে, বাস্তব কর্মপরিবেশের অভিজ্ঞতা তরুণদের চাকরিদাতাদের প্রত্যাশা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, “তরুণদের বুঝতে হবে কর্মক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে কী ধরনের আচরণ ও দক্ষতা প্রত্যাশা করা হয়। কর্মঅভিজ্ঞতা সেই প্রস্তুতি গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।”
উল্লেখ্য, অ্যামাজন নর্থ্যাম্পটনশায়ারে প্রায় ১০০ কোটি পাউন্ড বিনিয়োগের মাধ্যমে দুটি নতুন সরবরাহ কেন্দ্র স্থাপন করছে। এর মাধ্যমে প্রায় চার হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে যুক্তরাজ্যের খুচরা ব্যবসা খাতের প্রায় ৮০ জন শীর্ষ নির্বাহী সম্প্রতি সরকারের কাছে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়ে তরুণদের বেকারত্ব মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
ব্রিটিশ খুচরা ব্যবসায়ী পরিষদের উদ্যোগে পাঠানো ওই চিঠিতে তরুণদের নিয়োগ ব্যয় কমানোর দাবি জানানো হয়। ব্যবসায়িক নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি এবং জাতীয় বীমা অবদান বাড়ানোর ফলে বিদ্যালয় শেষ করা অনেক তরুণ প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরি পেতে আরও বেশি সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
চিঠিতে তারা সতর্ক করে বলেন, “তরুণদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার যে সুযোগের সিঁড়ি রয়েছে, তা এখন টালমাটাল অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির ব্যবহার আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও বাস্তব দক্ষতার বিকাশের বিকল্প নেই। তরুণদের কর্মবাজারে টিকে থাকতে হলে শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবার এবং কর্মক্ষেত্র—সব পক্ষকেই একযোগে কাজ করতে হবে। অন্যথায়, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের জন্য আরও বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হতে পারে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

