রেকর্ড তাপপ্রবাহে এবার বিপাকে পড়েছে যুক্তরাজ্যের বৃহৎ সুপারমার্কেটগুলো। অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রার কারণে টেসকো, এমঅ্যান্ডএস, সেইন্সবারিজ ও ওয়েটরোজসহ দেশের বিভিন্ন সুপারমার্কেটের শাখায় ফ্রিজ ও ফ্রিজার অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক দোকানে হিমায়িত ও ঠান্ডা খাদ্যপণ্যের তাক সম্পূর্ণ খালি হয়ে যায়। কোথাও কোথাও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি এড়াতে পুরো ফ্রিজ বিভাগই বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
জুন মাসের ইতিহাসে অন্যতম উষ্ণ কয়েকটি দিনের মধ্যেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় কমিউনিটি গ্রুপে বিভিন্ন সুপারমার্কেটের খালি ফ্রিজের ছবি ছড়িয়ে পড়ে। পরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একই ধরনের ঘটনার খবর আসতে শুরু করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাজ্যের অধিকাংশ সুপারমার্কেট এখনও কয়েক দশক পুরোনো কেন্দ্রীয় শীতলীকরণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। এসব ব্যবস্থায় ফ্রিজের উৎপন্ন তাপ বাইরে নির্গত করা হয়। কিন্তু বাইরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে যন্ত্রগুলো কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করে এবং কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঠান্ডা রাখতে পারে না।
ব্রিটিশ ফ্রোজেন ফুড ফেডারেশনের প্রধান নির্বাহী রুপার্ট অ্যাশবি বলেন, অনেক সুপারমার্কেটের রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থা ৩০ থেকে ৪০ বছর আগে স্থাপন করা হয়েছে। স্বাভাবিক আবহাওয়ায় এগুলো কার্যকর হলেও তীব্র তাপপ্রবাহে সেগুলো অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ে। ফলে পুরো শীতলীকরণ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।
তিনি জানান, বিষয়টি কেবল বিদ্যুৎ ব্যয়ের নয়; বরং খাদ্য নিরাপত্তার। কোনো খাদ্য নিরাপদ তাপমাত্রার বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে বড় সুপারমার্কেটগুলো ঝুঁকি না নিয়ে ফ্রিজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
বিভিন্ন সুপারমার্কেটে কর্মীরা দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় খাবার সরিয়ে ফেলেন। কোথাও অস্থায়ীভাবে ফ্রিজের সামনে পর্দা টানিয়ে ঠান্ডা বাতাস ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে বহু শাখায় সেই ব্যবস্থাও কার্যকর হয়নি।
উত্তর লন্ডনের টেম্পল ফরচুন এলাকার এমঅ্যান্ডএস শাখায় গিয়ে ক্রেতারা দেখতে পান প্রায় সব ফ্রিজই খালি। অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে সেই ছবি প্রকাশ করে বিস্ময় প্রকাশ করেন। একজন ক্রেতা বলেন, “মনে হচ্ছে আবার কোভিড মহামারির সময়ের মতো পরিস্থিতি ফিরে এসেছে।”
আরেকজন জানান, বিশ্বকাপ খেলা দেখার জন্য আইসক্রিম ও হিমায়িত খাবার কিনতে এসেও খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। অনেকেই একাধিক সুপারমার্কেট ঘুরেও কার্যকর ফ্রিজ খুঁজে পাননি।
শুধু লন্ডন নয়, ব্রিস্টল, নিউক্যাসল, কার্লাইল, টনটন, মার্থার টাইডফিল, আইল অব ম্যানসহ যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে একই ধরনের ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও অনলাইন খাদ্য সরবরাহও বাতিল করতে হয়েছে।
কোল্ড চেইন ফেডারেশনের প্রধান নির্বাহী ফিল প্লাক সতর্ক করে বলেছেন, তাপপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু সুপারমার্কেট নয়, খাদ্য সংরক্ষণের বৃহৎ কোল্ড স্টোরেজ ও গুদামগুলোর কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সুপারমার্কেটের মোট কার্বন নিঃসরণের বড় অংশই আসে শীতলীকরণ ব্যবস্থার বিদ্যুৎ ব্যবহার ও রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস থেকে। তাই জ্বালানি সাশ্রয় এবং ভবিষ্যতের তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় শীতলীকরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এ লক্ষ্যে ব্রিটিশ ফ্রোজেন ফুড ফেডারেশন সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের মতে, বর্তমানে ফ্রিজার সাধারণত মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পরিচালিত হয়, যা এক শতাব্দীরও বেশি আগে নির্ধারণ করা হয়েছিল। তাপমাত্রা তিন থেকে চার ডিগ্রি বাড়ানো হলে খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব না পড়লেও বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে এবং চরম তাপপ্রবাহেও শীতলীকরণ ব্যবস্থা সচল রাখা সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাজ্যে তাপপ্রবাহের ঘটনা বাড়তে থাকলে দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ও সুপারমার্কেট অবকাঠামোকে দ্রুত আধুনিকায়ন করা ছাড়া বিকল্প থাকবে না। অন্যথায় ভবিষ্যতে এমন সংকট আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ
এম.কে

