16.7 C
London
October 9, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

দত্তকের আড়ালে শিশু কেনাবেচা, ফেসবুকে দরদাম—আইন ও নজরদারির ঘাটতিতে উদ্বেগ

বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শিশু দত্তক দেওয়ার নামে অর্থের বিনিময়ে শিশু হস্তান্তরের প্রস্তাব, দরদাম এবং সম্ভাব্য প্রতারণার ঘটনা সামনে এসেছে। প্রথম আলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে শিশু দেওয়ার ও নেওয়ার বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হচ্ছে। এসব পোস্টে শিশুর বয়স, লিঙ্গ, অবস্থান এবং চাওয়া অর্থের উল্লেখও থাকছে। অনুসন্ধানে এমন কার্যক্রমের পাশাপাশি শিশু হস্তান্তরের নামে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও পাওয়া গেছে।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে ১২ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৯টি উন্মুক্ত ফেসবুক গ্রুপ যাচাই করা হয়। এর মধ্যে ১২টি গ্রুপের ২৮৮টি পোস্ট বিস্তারিত পর্যালোচনা করে ৩৪টি পোস্টে দত্তকের জন্য শিশু চাওয়ার এবং ৬৩টি পোস্টে শিশু দেওয়ার প্রস্তাব পাওয়া যায়। কিছু গ্রুপে কয়েক হাজার সদস্য থাকলেও কোনো কোনো গ্রুপের সদস্যসংখ্যা প্রায় ২০ হাজার পর্যন্ত ছিল। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কয়েকটি পোস্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশু হস্তান্তরের নামে একটি অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রমের অস্তিত্ব রয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, একটি ফেসবুক পোস্টে ছয় মাস বয়সী একটি ছেলে শিশুর জন্য দুই লাখ টাকা চাওয়া হয়েছিল। অনুসন্ধানকালে সংশ্লিষ্ট এক নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি শিশুটির জন্য এক লাখ টাকা দাবি করেন। শিশুটির ছবি ও টিকার কার্ডও পাঠানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এ ধরনের পোস্টে দেওয়া তথ্য, শিশুর পরিচয় এবং অর্থ দাবির পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্য যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু নেওয়ার আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার ঘটনাও উঠে এসেছে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে। কুষ্টিয়ার এক ব্যক্তি সংবাদমাধ্যমটিকে জানান, তিনি কয়েকবার প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একবার নবজাতক নেওয়ার জন্য দরদাম চূড়ান্ত করার পর তাকে বিকাশে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম পাঠাতে বলা হয়। টাকা পাঠানোর পর সংশ্লিষ্ট ফেসবুক গ্রুপ ও যোগাযোগের নম্বর বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘটনাটি দেখায়, শিশু দত্তকের নামে অর্থ লেনদেনের প্রস্তাব সম্ভাব্য প্রতারণার ঝুঁকিও তৈরি করছে।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ছেলে নবজাতকের জন্য তিন লাখ টাকা এবং মেয়ে নবজাতকের জন্য দুই লাখ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে বলে কয়েকটি সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গর্ভবতী নারীদের সন্তান জন্ম দেওয়ার আগেই যোগাযোগ করা হয় এবং প্রসব পর্যন্ত তাদের দেখভালের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এসব ঘটনায় অর্থের বিনিময়ে শিশু হস্তান্তরের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী বা সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

আইনবিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুকে অর্থের বিনিময়ে হস্তান্তরের পেছনে যদি বেআইনি উদ্দেশ্য, শোষণ বা পাচারের উপাদান থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুতর অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ও আইন গবেষক ফউজুল আজিম বলেছেন, এ ধরনের বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের সঙ্গে বাস্তব শিশুহস্তান্তরের যোগসূত্র রয়েছে কি না, অর্থ কারা নিচ্ছে এবং শিশুকে ভবিষ্যতে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে—এসব বিষয়ে তদন্ত প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদাও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারি নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরকারিভাবে সমাজসেবা অধিদপ্তরের ছোটমণি নিবাসে থাকা শিশুদের আদালতের মাধ্যমে অভিভাবকত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শিশু দেওয়া-নেওয়ার বিজ্ঞাপন, অর্থের দরদাম এবং সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারীদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। বৈধ অভিভাবকত্ব হস্তান্তর এবং অর্থের বিনিময়ে বেআইনি শিশু কেনাবেচার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য নিশ্চিত করা জরুরি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তার বক্তব্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, ফেসবুকে দত্তকের নামে প্রতারণার বিষয়ে তারা অবগত থাকলেও এভাবে শিশু বিক্রির নির্দিষ্ট অভিযোগ তাদের কাছে আসেনি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এ ধরনের কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত কাউকে আইনের আওতায় আনার তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তখন পর্যন্ত দিতে পারেননি।

শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের সবচেয়ে বড় কারণ হলো, অর্থের বিনিময়ে হস্তান্তরের পর তাদের কোথায় নেওয়া হচ্ছে এবং কী পরিবেশে রাখা হচ্ছে, তা নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে নির্যাতন, অবহেলা, শোষণ কিংবা পাচারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিটি দত্তকের বিজ্ঞাপনই শিশু পাচারের প্রমাণ নয়; প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে তদন্ত করে প্রকৃত উদ্দেশ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে।

আইনবিশেষজ্ঞরা শিশুদের বৈধ অভিভাবকত্ব হস্তান্তরের জন্য কার্যকর আইনি কাঠামো, সরকারি তদারকি এবং অনলাইন বিজ্ঞাপনের দ্রুত তদন্তের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ফেসবুকে শিশু কেনাবেচার প্রস্তাব শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট পোস্ট, যোগাযোগের তথ্য এবং অর্থ লেনদেনের প্রমাণ সংরক্ষণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানানোও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার রোধে প্ল্যাটফর্ম কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সূত্রঃ প্রথম আলো

এমকে

আরো পড়ুন

ঢাকায় কাঁকড়া ব্যবসা করবেন ট্রাম্প, ভাতের দোকান খুলবেন ইলন মাস্ক!

নিউজ ডেস্ক

নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশ থেকে কূটনীতিকদের পরিবার সরিয়ে নিচ্ছে ভারত

নিউজ ডেস্ক

কোরআনের আয়াতকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন, আনিসুল হককে লিগ্যাল নোটিশ