দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বৈরিতায় এবার পানি হয়ে উঠছে বড় কৌশলগত ইস্যু। ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি ঘিরে দুই দেশের টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পাওয়ার মধ্যেই সামনে এসেছে চীনের ভূমিকা। তিব্বত মালভূমি থেকে উৎপন্ন দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর উজানে অবস্থান করছে চীন। ফলে ভারত-পাকিস্তানের পানি বিরোধে বেইজিংয়ের অবস্থান ও সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা।
চীনের প্রভাবশালী কৌশলগত বিশ্লেষক ভিক্টর গাও ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি পুরোপুরি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০২৬ সালের জুনে পাকিস্তানে এক আলোচনায় তিনি চীনকে ভবিষ্যৎ একটি ত্রিপক্ষীয় পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর অংশ করার প্রস্তাবও দেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় চীন নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি পক্ষ হিসেবে দেখতে চায়।
দক্ষিণ এশিয়ার নদীগুলোর ভূগোলই এই সমীকরণের অন্যতম কারণ। তিব্বত মালভূমি থেকে ব্রহ্মপুত্রসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর উৎপত্তি। এসব নদীর পানি চীনের ভূখণ্ড অতিক্রম করে ভারত ও বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়। ফলে উজানের দেশ হিসেবে চীনের হাতে নদীর প্রবাহ, বাঁধ নির্মাণ এবং পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ভাটির দেশগুলোর তুলনায় স্বাভাবিকভাবেই বেশি ভৌগোলিক সুবিধা রয়েছে।
অন্যদিকে সিন্ধু নদী ব্যবস্থার ওপর পাকিস্তানের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। পাকিস্তানের বড় অংশের কৃষিজমি সেচের জন্য সিন্ধু নদ ও এর উপনদীগুলোর পানির ওপর নির্ভর করে। তাই ভারত থেকে পাকিস্তানের দিকে পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে তার প্রভাব শুধু পরিবেশ বা পানীয় জলের সংকটে সীমাবদ্ধ থাকবে না; কৃষি, খাদ্য উৎপাদন এবং অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা আসতে পারে।
১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দীর্ঘ সামরিক সংঘাত, একাধিক যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও চুক্তিটি কয়েক দশক কার্যকর ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার মধ্যে চুক্তিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিলের পাহেলগাম হামলার পর ভারত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়। এরপর পানি নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ে। পাকিস্তান বারবার সতর্ক করে আসছে, নদীর পানি আটকে দেওয়া বা প্রবাহ পরিবর্তনের যেকোনো পদক্ষেপ দেশটির জন্য গুরুতর সংকট তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতেই ‘পানিকে কৌশলগত অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। ভৌগোলিকভাবে উজানে অবস্থানরত কোনো দেশ বাঁধ, জলাধার বা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে নদীর পানির প্রবাহের সময় ও পরিমাণে প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও প্রতিটি অবকাঠামো প্রকল্পকে সরাসরি পানি অস্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়, তবু আন্তঃসীমান্ত নদীর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও তথ্য আদান-প্রদানের অভাব ভাটির দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়াতে পারে।
এখানেই ভারত ও চীনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়। পাকিস্তানের তুলনায় ভারত সিন্ধু নদী ব্যবস্থার অনেকাংশে উজানে অবস্থান করছে। আবার ব্রহ্মপুত্রসহ বেশ কয়েকটি নদীর ক্ষেত্রে ভারতের তুলনায় চীন উজানে। অর্থাৎ পাকিস্তানের ওপর ভারতের যে ভৌগোলিক সুবিধা রয়েছে, চীনের ক্ষেত্রেও ভারতের ওপর রয়েছে অনুরূপ একটি উজানের সুবিধা।
এই বাস্তবতা ভারতকে একই সঙ্গে দুই ধরনের পানি কূটনীতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু নদীর পানি নিয়ে বিরোধ, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রসহ আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ। ফলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পানিকে চাপ তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করার যেকোনো নীতি ভবিষ্যতে চীন-ভারত পানি সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
তবে ভিক্টর গাওয়ের প্রস্তাবের মধ্যে চীনকে ভারত-পাকিস্তানের পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামোয় যুক্ত করার বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার নদী কূটনীতি ভবিষ্যতে শুধু দিল্লি ও ইসলামাবাদের দ্বিপক্ষীয় বিষয় না থেকে বেইজিংকেও ঘিরে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক আলোচনায় পরিণত হতে পারে।
চীন ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও এই সমীকরণকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কারণে দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ। ফলে ভারত-পাকিস্তান পানি বিরোধে চীনের অবস্থানকে শুধু পরিবেশগত বা নদী ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি বাদ পড়ে যায়।
একই সময়ে ভারতও তিব্বত থেকে প্রবাহিত নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনায় চীনের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্রের উজানে চীনের বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্রহ্মপুত্রের পানি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রবেশ করে দেশের নদী ও কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়।
ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় নদী এখন আর কেবল প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। নদীর পানি হয়ে উঠছে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, অর্থনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি কৌশলগত সম্পদ। উজানের দেশগুলোর সিদ্ধান্ত ভাটির দেশগুলোর ওপর যে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে, ভারত-পাকিস্তান ও চীন-ভারত নদী বিরোধ তারই উদাহরণ।
তবে পানি নিয়ে উত্তেজনা বাড়লেও বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তঃসীমান্ত নদীকে সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করাই দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বেশি কার্যকর। নিয়মিত তথ্য বিনিময়, বন্যার আগাম সতর্কতা, নদীর প্রবাহ নিয়ে স্বচ্ছতা এবং বহুপক্ষীয় পানি ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যৎ সংকট এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং কৃষির ওপর বাড়তে থাকা চাপের কারণে পানির গুরুত্ব আরও বাড়বে। তাই ভারত-পাকিস্তানের সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে চলমান বিরোধ শুধু দুই দেশের সম্পর্কের পরীক্ষা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে চীন, তিব্বতের নদী এবং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার পানি নিরাপত্তা।
সব মিলিয়ে, আগামী দিনের দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতিতে ‘পানি কূটনীতি’ যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে যাচ্ছে, তার ইঙ্গিত স্পষ্ট। সিন্ধুর পানি নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের বিরোধ এবং ব্রহ্মপুত্র নিয়ে চীন-ভারতের উদ্বেগ একই আঞ্চলিক বাস্তবতার দুই দিক। পানি সহযোগিতার সেতু হবে, নাকি রাজনৈতিক চাপের নতুন হাতিয়ার—এই সিদ্ধান্তই আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্রঃ রয়টার্স \ এপি
এম.কে

