14.9 C
London
June 2, 2026
TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

বাংলাদেশের মাটির নিচে শত বছরের কয়লাঃ তবু বছরে ২৫ হাজার কোটি টাকার আমদানি

বাংলাদেশের মাটির নিচে বিলিয়ন টন কয়লার মজুদ থাকা সত্ত্বেও দেশ ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে আবিষ্কৃত কয়লা মজুদ দিয়েই অন্তত ২০০ থেকে ৩০০ বছর দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু নীতিগত অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং পরিবেশগত বিতর্কের কারণে সেই সম্পদ ব্যবহার না করে প্রতি বছর বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়ছে চাপ, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ থেকে এক কোটি ৫০ লাখ টন কয়লা আমদানি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার ওপর নির্ভর করে এই আমদানির পেছনে বছরে ব্যয় হয় প্রায় ২ থেকে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার সমান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বিপুল কয়লা মজুদ থাকা সত্ত্বেও এই বিপুল অর্থ বিদেশে চলে যাওয়া অর্থনীতি ও জ্বালানি খাত—উভয়ের জন্যই উদ্বেগের বিষয়।

বর্তমানে বাংলাদেশে আবিষ্কৃত প্রধান কয়লাখনির সংখ্যা পাঁচটি। এর মধ্যে রয়েছে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী ও দীঘিপাড়া, রংপুরের খালাশপীর এবং জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ কয়লাক্ষেত্র। বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, বড়পুকুরিয়ায় প্রায় ৩৯০ মিলিয়ন টন, ফুলবাড়ীতে ৫৭২ মিলিয়ন টন, দীঘিপাড়ায় ৬০০ মিলিয়ন টন এবং খালাশপীরে ১৪৩ মিলিয়ন টন কয়লার মজুদ রয়েছে। সবচেয়ে বড় মজুদ রয়েছে জামালগঞ্জে, যেখানে প্রায় ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন টন কয়লা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে সম্ভাব্য কয়লা মজুদের পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ১ বিলিয়ন টন।

বর্তমানে দেশে চালু কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বার্ষিক কয়লার চাহিদা প্রায় এক কোটি ২০ লাখ থেকে এক কোটি ৫০ লাখ টন। পায়রা, রামপাল, মাতারবাড়ী এবং বড়পুকুরিয়াসহ বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাহিদা বিবেচনায় পুরো মজুদ ব্যবহার করা গেলে প্রায় ৪৭০ থেকে ৫৯০ বছর পর্যন্ত দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে বাস্তবে কোনো খনির শতভাগ কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব নয়। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, ভূতাত্ত্বিক জটিলতা এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে সাধারণত ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ কয়লা উত্তোলনযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সে হিসেবে মোট মজুদের প্রায় অর্ধেক ব্যবহার করা গেলেও তা দিয়ে অন্তত ২৩০ থেকে ৩০০ বছর দেশের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।

এত বড় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে দেশের একমাত্র উৎপাদনশীল কয়লাখনি হলো দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া। এখান থেকে বছরে গড়ে মাত্র ৭ থেকে ১০ লাখ টন কয়লা উত্তোলন করা হয়, যা জাতীয় চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে দেশের প্রায় সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন আমদানিকৃত কয়লার ওপর নির্ভরশীল।

পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, বাগেরহাটের রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কক্সবাজারের মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বিদেশি কয়লায় পরিচালিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের পরিবর্তন কিংবা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ধরনের সংকট দেখা দিলেই এর সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে।

বাংলাদেশে কয়লা উত্তোলন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নীতিগত বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ওপেন-পিট বা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে উত্তোলন এবং ভূগর্ভস্থ পদ্ধতির মধ্যে কোনটি গ্রহণ করা হবে তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, দেশের অধিকাংশ কয়লাখনি তুলনামূলক কম গভীরতায় অবস্থিত হওয়ায় ওপেন-পিট পদ্ধতিতে অধিক পরিমাণ কয়লা কম খরচে উত্তোলন সম্ভব। তবে এতে কৃষিজমি ক্ষতি, বসতভিটা উচ্ছেদ এবং পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

২০০৬ সালে ফুলবাড়ী কয়লাখনি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে আন্দোলন ও হতাহতের ঘটনার পর সরকার এ বিষয়ে আরও সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে। এরপর থেকে ফুলবাড়ী প্রকল্প কার্যত স্থবির হয়ে রয়েছে।

অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিকে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করা হলেও এটি ব্যয়বহুল এবং প্রযুক্তিগতভাবে জটিল। বড়পুকুরিয়া খনিতে এই পদ্ধতিতে প্রত্যাশিত উৎপাদন অর্জন না হওয়ায় নতুন প্রকল্পগুলোতেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জামালগঞ্জ কয়লাক্ষেত্রের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ আরও বেশি, কারণ এর কয়লার স্তর মাটির প্রায় ৬০০ থেকে এক হাজার মিটার গভীরে অবস্থান করছে, যা বর্তমান প্রযুক্তি ও ব্যয় কাঠামোয় বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয় বলে মনে করা হচ্ছে।

জ্বালানি খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো জাতীয় কয়লানীতি চূড়ান্ত না হওয়া। প্রায় দেড় যুগ আগে ২০০৮ সালে খসড়া কয়লানীতি প্রণয়ন করা হলেও তা এখনো অনুমোদন পায়নি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিদেশি বিনিয়োগ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগও অগ্রগতি পায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার একদিকে নতুন নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে, অন্যদিকে দেশীয় কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। এর ফলে আমদানিনির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও তীব্র হচ্ছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার মূল্য কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তারা বলেন, জ্বালানি সরবরাহ যদি পুরোপুরি বিদেশি বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে যেকোনো বৈশ্বিক সংকট দেশের বিদ্যুৎ খাতকে সরাসরি প্রভাবিত করবে। সে সময় ডলার সংকটের কারণে কয়লা আমদানিতে জটিলতা তৈরি হওয়ায় কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছিল।

তবে পরিবেশবিদদের একটি অংশ মনে করেন, বিশ্ব যখন ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন নতুন করে বৃহৎ পরিসরে কয়লা উত্তোলন পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্যদিকে জ্বালানি অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় আগামী কয়েক দশকে কয়লা পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। গ্যাসের মজুদ হ্রাস, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির উচ্চ ব্যয় এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সীমিত সক্ষমতার কারণে দেশীয় কয়লার পরিকল্পিত ব্যবহার এখনো একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প।

তাদের মতে, পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশীয় কয়লার ব্যবহার বাড়ানো গেলে একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে, অন্যদিকে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। দেশের মাটির নিচে শত শত বছরের জ্বালানি মজুদ রেখে বিপুল অর্থ ব্যয়ে কয়লা আমদানির বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা—উভয়ের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্রঃ স্যোশাল মিডিয়া

এম.কে

আরো পড়ুন

ছেলের পরকীয়া ঠেকাতে বিমান থামালেন মা, বোমা ভয়ের নাটক ফাঁস গ্রেপ্তার ৩

২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে হবে জাতীয় নির্বাচনঃ উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শপথবাক্য পরিবর্তন, পুরোনোটি পাঠের নির্দেশ