TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যের মিডলসব্রোতে দোকানচুরি ভয়াবহ রূপ নিয়েছেঃ জাতীয় গড়ের প্রায় দ্বিগুণ

যুক্তরাজ্যের মিডলসব্রো শহরে দোকানচুরির ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। প্রতি এক হাজার মানুষের বিপরীতে ১৫ দশমিক ৯টি দোকানচুরির ঘটনা নথিভুক্ত হচ্ছে, যা ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের জাতীয় গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। পরিস্থিতির কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কর্মীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা এবং আতঙ্ক ক্রমেই বাড়ছে।

মিডলসব্রোর স্থানীয় ব্যবসায়ী বশির গত ৩০ বছর ধরে শহরটির ব্যবসা খাতের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে তিনি ‘গো লোকাল এক্সট্রা’ ব্র্যান্ডের অধীনে পাঁচটি কনভিনিয়েন্স স্টোর পরিচালনা করছেন। তিন দশক আগে বেল ভিউ এলাকায় প্রথম দোকান কেনার মধ্য দিয়ে তার ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু হয়।

দোকানচুরির ভয়াবহতা বোঝাতে গিয়ে বে বশিরের একটি দোকানের কর্মীদের ওপর সংঘটিত হামলার ঘটনা উঠে এসেছে। একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মিডলসব্রোর অন্য একটি দোকানে কর্মরত একজন নারী কর্মীকে মুখোশ পরা এক ব্যক্তি বিশাল একটি ছুরি দেখিয়ে হুমকি দিচ্ছে এবং নগদ অর্থ দাবি করছে।

ওই ব্যক্তি জোর করে ক্যাশ কাউন্টারের পেছনে ঢোকার চেষ্টা করলে নারী কর্মীটি একটি স্টুল ব্যবহার করে তাকে ঠেকানোর চেষ্টা করেন। ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে প্রতিবেদক মিয়েকা স্মাইলস বলেন, একজন নারী, যিনি একই সঙ্গে মা ও দাদি—তাকে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে দেখা অত্যন্ত মর্মান্তিক।

ব্যবসায়ী বশির বলেন, কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তিনি বলেন, ওই নারী একজন মা ও দাদি এবং স্বাভাবিকভাবেই তিনি ঘটনার পর কোনো ধরনের প্রতিশোধ বা অতিরিক্ত ঝামেলার আশঙ্কায় থাকতে চান না। কিন্তু ঘটনার মানসিক চাপ ও ভয় তাকে এবং তার সহকর্মীদেরই বহন করতে হয়।

বশিরের ভাষায়, মানুষ শুধু নিজের দায়িত্ব পালন করতে কর্মস্থলে আসবে এবং সেখানে তাকে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে—এটি কোনোভাবেই ন্যায্য নয়।

পরিস্থিতির কারণে দোকানগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। কর্মীদের শরীরে পরার ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো ঘটনা ঘটলে তার প্রমাণ সংরক্ষণ করা যায়। কর্মীরা একে অপরের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের জন্য হেডসেট ব্যবহার করেন। দোকানের কাউন্টারের সামনে কোভিড মহামারির সময় স্থাপন করা মোটা সুরক্ষা পর্দা এখনো রাখা হয়েছে।

এছাড়া জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের জন্য দোকানে আতঙ্ক সংকেতের বোতামও রয়েছে। অর্থাৎ সাধারণ খুচরা ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।

শুধু বড় দোকান নয়, শহরের ছোট ব্যবসাগুলোও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। লিনথর্প রোডের ব্যবসায়ী আতুল কেলুত জানান, দোকানচুরির ঘটনায় কিশোরদের জড়িত থাকার প্রবণতা বেড়েছে।

২৯ বছর বয়সী আতুল কেলুত মিডলসব্রো শহরের কেন্দ্রে ‘ফোন ক্যাসল’ নামে একটি ব্যবসা পরিচালনা করেন। তার অভিযোগ, কিশোররা প্রায়ই দলবদ্ধ হয়ে দোকানে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে একজন দোকানদারের সঙ্গে কথা বলে ব্যস্ত রাখে, আর অন্যজন সেই সুযোগে পণ্য চুরি করে নিয়ে যায়।

আতুলের মতে, এসব ঘটনা সামাল দিতে যে সময় চলে যায়, তা ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে। এর পাশাপাশি এসব ঘটনার কারণে তার ব্যক্তিগত মানসিক শান্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি জানান, নিয়মিত দোকানচুরির কারণে গ্রাহকদের প্রতি তার আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। একজন তরুণ ব্যবসায়ী হিসেবে সফলভাবে নিজের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার চেষ্টা করার সময় এমন পরিস্থিতি তার জন্য বিশেষভাবে হতাশাজনক।

মিডলসব্রোর শহরকেন্দ্রের ব্যবসা পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে কারণ আশপাশের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যেও যারা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের জন্য দোকানচুরি ও কর্মীদের নিরাপত্তা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে ক্লিভল্যান্ড পুলিশ এবং মিডলসব্রো কাউন্সিল জানিয়েছে, শহরের কেন্দ্রকে আরও নিরাপদ করতে এবং দোকানচুরির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তারা কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ এখনো কাটেনি।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দোকানচুরি শুধু পণ্য বা অর্থের ক্ষতি করছে না; এর সঙ্গে কর্মীদের মানসিক চাপ, নিরাপত্তাহীনতা এবং গ্রাহকদের প্রতি আস্থার সংকটও বাড়ছে। বিশেষ করে অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানো বা দোকানের কর্মীদের ওপর হামলার মতো ঘটনা স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে আরও আতঙ্ক তৈরি করছে।

ফলে মিডলসব্রোর ব্যবসায়ীদের জন্য দোকানচুরি এখন কেবল আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়, বরং কর্মীদের নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার সঙ্গেও সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন, যাতে দোকানে কাজ করা কর্মীরা ভয় ছাড়া নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

অন্যদিকে, কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের পাশাপাশি দোকানচুরি প্রতিরোধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে মিডলসব্রোর বহু ব্যবসায়ী এমন এক বাস্তবতার মধ্যে কাজ করছেন, যেখানে চুরি, হুমকি ও নিরাপত্তার ভয় ধীরে ধীরে তাদের দৈনন্দিন ব্যবসা জীবনের ‘নতুন স্বাভাবিক’ পরিস্থিতিতে পরিণত হচ্ছে।

সূত্রঃ ডেইলি এক্সপ্রেস

এম.কে

আরো পড়ুন

ইটিএ ছাড়া ভ্রমণ নয়ঃ যুক্তরাজ্যে আজ থেকে পূর্ণমাত্রায় কার্যকর নতুন সীমান্তনীতি

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে পালিয়েছিলেন ক্যামডেনের মেয়র

অনলাইন ডেস্ক

লন্ডনের মার্কিন দূতাবাসের £১৫.৬ মিলিয়ন কনজেশন চার্জ বকেয়া