রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সংঘাত এবং ইউরোপের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে নিজেদের সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে যুক্তরাজ্য। আগামী বছর প্রায় ৯৫ হাজার সাবেক সামরিক সদস্য নিয়ে গঠিত ‘স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ’কে কীভাবে দ্রুত সক্রিয় করা যায়, তা পরীক্ষা করতে বড় পরিসরের একটি মহড়া আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে ব্রিটিশ সরকার।
ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক মন্ত্রী লুইস স্যান্ডার-জোনস পার্লামেন্টের জাতীয় স্থিতিস্থাপকতা-সংক্রান্ত কমিটিকে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকা এই রিজার্ভ বাহিনীকে ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া হবে। আগামী বছরের মহড়ায় সাবেক সেনাদের সঙ্গে যোগাযোগ, তাদের ডেকে আনা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ এবং দায়িত্ব পালনের উপযোগী করে তোলার পুরো প্রক্রিয়া পরীক্ষা করা হবে।
তবে ব্রিটিশ সরকারের এই উদ্যোগকে ৯৫ হাজার অবসরপ্রাপ্ত সেনাকে তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত একটি প্রস্তুতিমূলক মহড়া। কোনো বড় ধরনের জাতীয় সংকট, যুদ্ধ বা নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরি হলে দেশটি কত দ্রুত তার সাবেক সামরিক সদস্যদের কাজে ফিরিয়ে আনতে পারবে—মহড়ার মাধ্যমে সেটিই যাচাই করা হবে।
ব্রিটিশ সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ‘স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভে’ রয়েছেন প্রায় ৯৫ হাজার সাবেক নিয়মিত ও রিজার্ভ সামরিক সদস্য। এ বাহিনী প্রায় ৩২ হাজার সক্রিয় স্বেচ্ছাসেবী রিজার্ভ সদস্যের থেকে আলাদা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বিশাল সাবেক সেনা রিজার্ভ খুব কমই ব্যবহার করা হয়েছে। এবার সেই ব্যবস্থাকে কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
সাবেক সামরিক সদস্যদের প্রয়োজনে পুনরায় দায়িত্বে ফিরিয়ে আনার আইনি কাঠামোও সম্প্রসারিত করছে ব্রিটিশ সরকার। আর্মড ফোর্সেস বিল ২০২৬-এ রিজার্ভ বাহিনীর পরিধি বাড়ানো এবং প্রয়োজনের সময় অভিজ্ঞ সাবেক সেনাদের কাজে লাগানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পুনরায় ডাকার সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৫৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৬৫ বছর করা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, আগে যেখানে ‘জাতীয় বিপদ, বড় ধরনের জরুরি অবস্থা বা যুক্তরাজ্যে হামলা’র মতো পরিস্থিতিতে পুনরায় ডাকার বিধান ছিল, নতুন আইনি ব্যবস্থায় ‘যুদ্ধের প্রস্তুতি’ বা ‘warlike preparations’-এর ক্ষেত্রেও রিজার্ভ সদস্যদের ফিরিয়ে আনার সুযোগ রাখা হচ্ছে।
এর ফলে কোনো সংঘাত সরাসরি ব্রিটিশ ভূখণ্ডে পৌঁছানোর আগেই সামরিক প্রস্তুতি জোরদারের জন্য অভিজ্ঞ সাবেক সেনাদের কাজে লাগানোর আইনি সুযোগ বাড়বে।
ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই বিশাল রিজার্ভ বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখা।
প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল স্যার রিচার্ড নাইটন সতর্ক করেছেন যে, স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ সদস্যদের নিয়মিতভাবে শনাক্ত ও যোগাযোগ করার মতো কার্যকর ব্যবস্থা ব্রিটেনের নেই। ২০২৫ সালের কৌশলগত প্রতিরক্ষা পর্যালোচনার নেতৃত্ব দেওয়া লর্ড রবার্টসন অব পোর্ট এলেন-ও এর আগে বলেছিলেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অনেক রিজার্ভ সদস্য বর্তমানে কোথায় আছেন, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য রাখে না।
আগামী বছরের মহড়ায় তাই শুধু সেনাদের ডাকার বিষয়টি নয়, বরং কে কোথায় আছেন, কীভাবে তাদের দ্রুত যোগাযোগ করা যাবে, কত দ্রুত দায়িত্বে ফেরানো যাবে এবং প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম কীভাবে সরবরাহ করা হবে—এসব বিষয়ও পরীক্ষা করা হবে।
ব্রিটেনের এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত মোকাবিলায় ইউরোপের প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
সাম্প্রতিক এক ইউরোপীয় নিরাপত্তা আলোচনায় প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ‘যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির লড়াই’ হলে ইউরোপ বর্তমানে তা দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা ও জনসমর্থনের দিক থেকে প্রস্তুত নয়। রাশিয়ার সাইবার হামলা, বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকেও ইউরোপের জন্য বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই বৃহত্তর নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যেই ব্রিটেন নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত জনবল বাড়ানোর ব্যবস্থাও শক্তিশালী করছে।
ব্রিটিশ সরকারের ওপর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর রাজনৈতিক ও সামরিক চাপও ক্রমেই বাড়ছে। সরকার দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির ৩.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ব্যয় প্রায় ২.৬ শতাংশে পৌঁছানোর পথে রয়েছে এবং ৩ শতাংশে পৌঁছানোর নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এদিকে অর্থের সংকটের কারণে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী সম্প্রতি কিছু বড় প্রশিক্ষণ মহড়া স্থগিত করেছে। তবে মোতায়েনের প্রস্তুতিতে থাকা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া বাহিনীর প্রশিক্ষণ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে ড্রোন যুদ্ধ ও আধুনিক যুদ্ধকৌশলভিত্তিক প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
৯৫ হাজার সাবেক সেনাকে ঘিরে মহড়ার খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি’ নিয়ে ব্যাপক আলোচনাও শুরু হয়েছে বলে খবরে জানা যায়।
সূত্রঃ দ্য টাইমস\দ্যা টেলিগ্রাফ
এম.কে

