TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

বিদেশে জন্মানো ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে নাইজাল ফারাজের রিফর্ম পার্টির বিতর্কিত নীতি

ব্রিটেনে সামাজিক আবাসন পাওয়ার ক্ষেত্রে জন্মস্থানকে বড় মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে। দলটির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিদেশে জন্ম নেওয়া ব্রিটিশ নাগরিকরা যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া নাগরিকদের তুলনায় সামাজিক আবাসনের তালিকায় পিছিয়ে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে ৩৫ বছরের কম বয়সী সন্তানসহ বিবাহিত দম্পতি এবং কর্মজীবী ব্রিটিশদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে দলটি।

রিফর্ম ইউকে সোমবার লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ পরিকল্পনা প্রকাশ করার কথা জানিয়েছে। দলটির দাবি, ব্রিটেনে বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ সামাজিক আবাসনের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের মতে, সীমিত সামাজিক আবাসনের সুযোগের ক্ষেত্রে তরুণ ব্রিটিশ কর্মজীবীদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

রিফর্ম ইউকের ডেপুটি নেতা রিচার্ড টাইস দাবি করেছেন, সামাজিক আবাসনে থাকা পরিবারের অর্ধেকেরও কম সদস্য কর্মরত এবং পাঁচ লাখের বেশি সামাজিক আবাসন বিদেশি নাগরিকদের দখলে রয়েছে। তার ভাষ্য, তরুণ ব্রিটিশরা কঠোর পরিশ্রম করেও পরিবারের বাড়ি থেকে বের হয়ে স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারছেন না; অনেককে অপরিচিতদের সঙ্গে বাড়ি ভাগ করে থাকতে হচ্ছে।

তবে দলটির নতুন পরিকল্পনা শুধু বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করছে না; বিদেশে জন্ম নেওয়া ব্রিটিশ নাগরিকদেরও সামাজিক আবাসনের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি এতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত এমন ব্রিটিশ নাগরিকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে, যারা জন্মসূত্রে ব্রিটিশ না হলেও নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন।

এর আগে ফারাজ বিদেশি নাগরিকদের সামাজিক আবাসন থেকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেই পরিকল্পনায় সামাজিক আবাসনে থাকা বিদেশি নাগরিকদের তিন মাসের মধ্যে বেসরকারি বাসস্থানে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল; অন্যথায় তাদের বহিষ্কারের মুখে পড়তে হতে পারে বলে প্রস্তাব করা হয়েছিল।

নতুন পরিকল্পনায় অবশ্য কিছু বিদেশে জন্ম নেওয়া ব্রিটিশ নাগরিককে ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যেমন, ব্রিটিশ বাবা-মা সাময়িকভাবে বিদেশে অবস্থান করার সময় যেসব সন্তান জন্মগ্রহণ করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হতে পারে।

রিফর্ম ইউকের প্রস্তাবে সাবেক সেনাসদস্যদেরও অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। যদিও সামরিক বাহিনীর সদস্য, সাবেক সেনা এবং তাদের পরিবার ইতোমধ্যে বিদ্যমান সরকারি নীতির আওতায় সামাজিক আবাসনে অগ্রাধিকার পেয়ে থাকেন।

রিফর্ম ইউকের পরিকল্পনার কঠোর সমালোচনা করেছে আবাসনবিষয়ক দাতব্য সংস্থা শেল্টার। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী সারাহ এলিয়টের মতে, জাতীয়তা, কর্মসংস্থান ও পারিবারিক অবস্থাকে আবাসনের প্রয়োজনীয়তার ওপরে স্থান দিলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের নীতি পরিবারগুলোর জীবনকে বিপর্যস্ত করতে পারে, সমাজে বিভাজন বাড়াতে পারে এবং আরও মানুষকে গৃহহীনতার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। বিশেষ করে গৃহস্থালি সহিংসতা বা নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের জন্য এমন নীতি গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

লেবার পার্টিও রিফর্মের পরিকল্পনার সমালোচনা করেছে। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অবৈধ অভিবাসী, আশ্রয়প্রার্থী এবং শিক্ষার্থী বা কর্ম ভিসায় থাকা অভিবাসীরা বর্তমানে সামাজিক আবাসনের জন্য যোগ্য নন। ফলে রিফর্মের নতুন নীতি মূলত দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী এবং দেশটির অর্থনীতি ও জনসেবায় অবদান রাখা মানুষদেরও প্রভাবিত করতে পারে, যাদের মধ্যে এনএইচএস কর্মীরাও রয়েছেন।

সামাজিক আবাসন নিয়ে কঠোর অগ্রাধিকার নীতির পাশাপাশি রিফর্ম ইউকে বছরে ৫০ হাজার সামাজিকভাবে সাশ্রয়ী বাড়ি নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সরকারের বর্তমান পরিকল্পনায় এক দশক ধরে গড়ে বছরে ১৮ হাজার সামাজিক বাড়ি নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রিফর্মের প্রতিশ্রুতি অনেক বেশি।

লেবার সরকারের আবাসন পরিকল্পনার আওতায় ৩৯ বিলিয়ন পাউন্ডের সাশ্রয়ী আবাসন তহবিল রয়েছে, যার ৬০ শতাংশ সামাজিক আবাসন নির্মাণে ব্যয় করার কথা।

তবে রিফর্ম ইউকে দাবি করেছে, তাদের উচ্চাভিলাষী নির্মাণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নতুন ঋণ বা অতিরিক্ত করের প্রয়োজন হবে না। কিন্তু এত বড় প্রকল্পের অর্থ কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে দলটি এখনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি।

সব মিলিয়ে, রিফর্ম ইউকের প্রস্তাব ব্রিটেনের সামাজিক আবাসন ব্যবস্থায় ‘বাসস্থানের প্রয়োজন’ বনাম ‘জন্মস্থান ও জাতীয়তা’—কোন বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে, সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করতে হলে বিদ্যমান আইনে পরিবর্তন আনতে হবে বলেও দলটি স্বীকার করেছে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

ধনীদের বুস্টার ডোজের কারণে বিশ্বজুড়ে আরও বেশি মৃত্যুর সম্ভাবনা!

যুক্তরাজ্যে স্থানীয় নির্বাচনের আগে সংকটে লেবার নেতৃত্ব, ফারাজের দলে বাড়ছে জনসমর্থন

যুক্তরাজ্যে সিরিয়ার অভিবাসনপ্রার্থীর হাতে ১২ বছর বয়সী মেয়ে ধর্ষণঃ কারাদণ্ড ১২ বছর