ব্রেক্সিট-পরবর্তী ইউরোপীয় ভ্রমণ নিয়মের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত সম্পর্কে না জানায় গ্রিসগামী ফ্লাইটে উঠতে পারলেন না এক ব্রিটিশ দম্পতি। পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ না হলেও ইস্যুর তারিখ থেকে ১০ বছর পেরিয়ে যাওয়ায় তাদের যাত্রা আটকে দেওয়া হয়। এর ফলে বিমানভাড়া ও বিমানবন্দরের হোটেলের খরচ মিলিয়ে প্রায় ৫০০ পাউন্ড হারিয়েছেন তারা। ঘটনাটি আবারও ব্রিটিশ ভ্রমণকারীদের মধ্যে পাসপোর্টের নিয়ম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
৭৮ বছর বয়সী সেলিয়া জেনকিন্স ও তার ৮২ বছর বয়সী স্বামী রিসের ব্রিস্টল বিমানবন্দর থেকে গ্রিসের কেফালোনিয়া যাওয়ার কথা ছিল। গ্রিসের একটি দ্বীপে তাদের নিজস্ব বাড়ি রয়েছে এবং সেখানে ছয় মাস অবস্থানের পরিকল্পনা করেছিলেন তারা। কিন্তু বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর জেট২-এর কর্মীরা তাদের জানিয়ে দেন, পাসপোর্টের কারণে তারা ওই ফ্লাইটে ভ্রমণ করতে পারবেন না।
দম্পতির পাসপোর্টে মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ তখনও পার হয়নি। কিন্তু সমস্যাটি ছিল পাসপোর্টের ইস্যুর তারিখ নিয়ে। জেট২-এর কর্মীদের হিসাবে, তাদের পাসপোর্ট ইস্যুর তারিখ থেকে ১০ বছর ও তিন দিন পুরোনো হয়ে গিয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের দৃষ্টিতে ‘তৃতীয় দেশের নাগরিক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে ইইউ ও শেনজেন এলাকায় প্রবেশের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ পাসপোর্টধারীদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু কঠোর শর্ত প্রযোজ্য। এর অন্যতম হলো, ভ্রমণের দিন পাসপোর্ট ইস্যুর তারিখ থেকে ১০ বছরের বেশি পুরোনো হতে পারবে না। একই সঙ্গে ইইউ থেকে নির্ধারিত ফেরার তারিখের পর অন্তত তিন মাস পাসপোর্টের বৈধতা থাকতে হবে।
বিমানবন্দরে আটকে যাওয়ার অভিজ্ঞতাকে অত্যন্ত অপমানজনক হিসেবে বর্ণনা করেছেন সেলিয়া। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের সীমান্ত নিরাপত্তা এলাকা দিয়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং পরিস্থিতিতে তাদের নিজেদের অপরাধীর মতো মনে হচ্ছিল।
সেলিয়ার দাবি, সরকার ও বিমান সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে নিয়মটি যথেষ্ট পরিষ্কারভাবে জানানো হয়নি। তারা পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ দেখেছিলেন এবং সেটি বৈধ থাকায় ভ্রমণে কোনো সমস্যা হবে না বলেই মনে করেছিলেন। কিন্তু পাসপোর্টের ইস্যুর তারিখও যে ইউরোপ ভ্রমণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি তারা বুঝতে পারেননি।
এই ভুলের আর্থিক মূল্যও কম নয়। বিমান টিকিটের পাশাপাশি তারা বিমানবন্দরের একটি হোটেলের জন্যও অর্থ পরিশোধ করেছিলেন। ভ্রমণ বাতিল হওয়ায় সব মিলিয়ে তাদের প্রায় ৫০০ পাউন্ড ক্ষতি হয়েছে। নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করার পরও গ্রিসে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পরিকল্পনা অনুযায়ী দেখা করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই নিয়মটি নতুন নয়। ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য পাসপোর্টের ১০ বছরের এই বিধিনিষেধ ২০২১ সাল থেকেই কার্যকর। এরপরও অনেক ভ্রমণকারী নিয়মটি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন বলে ঘটনাটি সামনে এসেছে।
নিয়ম অনুযায়ী, ইইউতে প্রবেশের দিন ব্রিটিশ পাসপোর্টটি ১০ বছরের বেশি আগে ইস্যু করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। পাশাপাশি ইউরোপ থেকে বের হওয়ার নির্ধারিত তারিখে পাসপোর্টের অন্তত তিন মাসের বৈধতা থাকতে হবে। ফলে পাসপোর্টে ছাপা ‘expiry date’ বা মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ ঠিক থাকলেও সেটি ইউরোপ ভ্রমণের জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো ব্রিটিশ নাগরিক ইউরোপ থেকে ফিরে আসার পর পাসপোর্টে ঠিক তিন মাসের বৈধতা থাকলেও পরের মাসে আবার ইইউ ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে নতুন পাসপোর্ট প্রয়োজন হতে পারে। কারণ প্রবেশের সময় পাসপোর্টের বয়স এবং ফেরার সময় অবশিষ্ট বৈধতা—দুটিই বিবেচনা করা হয়।
যুক্তরাজ্যের পাসপোর্ট নবায়নের প্রক্রিয়া সাধারণত প্রায় তিন সপ্তাহে সম্পন্ন হতে পারে। তবে ব্যস্ত ভ্রমণ মৌসুমে সম্ভাব্য বিলম্ব এড়াতে সরকার ভ্রমণের অন্তত ১০ সপ্তাহ আগে নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করার পরামর্শ দেয়।
সেলিয়া ও রিসের ঘটনা ব্রিটিশ ভ্রমণকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। শুধু পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ দেখে বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তুতি নিলে বড় ধরনের বিপাকে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপে যাওয়ার আগে পাসপোর্টের ইস্যুর তারিখ, মেয়াদ এবং ফেরার নির্ধারিত তারিখে অবশিষ্ট বৈধতা—সবকিছু যাচাই করার পরই যাত্রা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সূত্রঃ দ্য সান
এম.কে

