TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেনে অপরাধ করেও নানা সরকারি সুবিধাঃ ২১ হাজারের বেশি অপরাধী বহিষ্কারের অপেক্ষায়

ব্রিটেনে আশ্রয়প্রার্থী ও বিদেশি অপরাধীদের আবাসন, আইনি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ এবং অন্যান্য সরকারি সুবিধার ব্যয় নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সান-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপরাধে দণ্ডিত বা বহিষ্কারের আওতায় থাকা একাধিক বিদেশি নাগরিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন ধরনের সরকারি সুবিধা পেয়েছেন। এসব সুবিধার অর্থের বড় অংশ এসেছে করদাতাদের কাছ থেকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুনের শেষ নাগাদ ব্রিটেনে বহিষ্কার করা উচিত ছিল—এমন ২১ হাজার ২৯৪ জন বিদেশি অপরাধী মুক্ত অবস্থায় ছিলেন। দুই বছর আগে লেবার পার্টি সরকার গঠনের সময় এই সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৬৭৭। অর্থাৎ, এ সময়ে সংখ্যাটি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটেনে ৯৩ হাজার ২৯৩ জন আশ্রয়প্রার্থী তখনও সরকারি সহায়তা পাচ্ছিলেন। তাদের মধ্যে ৬৯ হাজার ৩৮ জন বাড়ি, ফ্ল্যাট বা যৌথ আবাসনে এবং ১৬ হাজার ২১ জন হোটেলে অবস্থান করছিলেন।

প্রতিবেদনে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদ আব্বাসের ঘটনা। দ্য সান-এর দাবি, ফিলিস্তিনি শরণার্থী হিসেবে পরিচয় দেওয়া ২৯ বছর বয়সী আব্বাসকে ২ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড মূল্যের একটি বাড়ি দেওয়া হয়েছিল। এক পুলিশ কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনায় কারাদণ্ড এড়ানোর পর বাড়িটি পাওয়ার মাত্র দুই দিন পর তিনি একটি পরিবারের বাড়িতে ঢুকে দুই কিশোরীর সামনে অশালীন আচরণ করেন বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

ইথিওপীয় নাগরিক হাদুশ কেবাতুর ঘটনাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ২৯ জুন ব্রিটেনে পৌঁছানোর পর তার আবাসনের ব্যয় সরকার বহন করেছিল বলে জানায় দ্য সান। পরে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর প্রতি যৌন হয়রানি এবং এক নারীকে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় তিনি ১২ মাসের কারাদণ্ড পান। কারাগার থেকে ভুলবশত মুক্তি পাওয়ার পর তাকে খুঁজে বের করতে পুলিশ অভিযান চালায়। পরে বহিষ্কারের বিমানে শান্তভাবে উঠতে রাজি করাতে তাকে ৫০০ পাউন্ড দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত পাঁচজন নিরাপত্তাকর্মীর পাহারায় তাকে ইথিওপিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়।

হামাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আলোচিত মুহাম্মদ কাসেম সাওয়ালহার বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। দ্য সান-এর দাবি, ১৯৯০-এর দশকে ব্রিটেনে আসার পর তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পান। ২০০৩ সালে উত্তর লন্ডনের বারনেট কাউন্সিল তাকে একটি বাড়ির ভাড়াটিয়া হিসেবে বরাদ্দ দেয়। ২০২১ সালে তিনি ও তার স্ত্রী সরকারি ‘রাইট টু বাই’ প্রকল্পের আওতায় বাড়িটি কেনেন। এতে বাড়ির মূল দামের তুলনায় ১ লাখ ১২ হাজার পাউন্ডের বেশি ছাড় দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে হামাস-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য ও অভিযোগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত ১১টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করা আবু হামজার স্ত্রী নাজাত চাফের আবাসন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দ্য সান। সংবাদমাধ্যমটির দাবি, পশ্চিম লন্ডনের শেফার্ডস বুশে প্রায় ১৭ লাখ পাউন্ড মূল্যের পাঁচ শয়নকক্ষের একটি কাউন্সিল বাড়িতে তিনি বসবাস করছেন। বাড়িটির সংস্কারে প্রায় ৭০ হাজার পাউন্ড সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ভাড়ার চুক্তির কারণে কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ তাকে বাড়ি থেকে সরিয়ে দিতে পারছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সোমালীয় নাগরিক হায়বে কাবদিরাহমান নুরের ঘটনাও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ছোট নৌকায় ব্রিটেনে আসার পর তার আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলেও আপিল চলাকালে তিনি হোম অফিসের আবাসনে ছিলেন। ২০২৫ সালের মে মাসে ডার্বির একটি ব্যাংকে গুরবিন্দর জোহাল নামের এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় নুরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যার মধ্যে ন্যূনতম ২৫ বছর কারাভোগের নির্দেশ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এদিকে, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধে কারাদণ্ড ভোগ করা জামিল আহমেদের বহিষ্কার ঠেকাতে প্রায় ১০ বছর ধরে আইনি লড়াইয়ে সরকারি অর্থে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছে দ্য সান। শেষ পর্যন্ত তিনি স্কটল্যান্ডে থাকার অধিকার পান। সংবাদমাধ্যমটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্কটল্যান্ডে আশ্রয়প্রার্থী, শরণার্থী ও বৈধ অভিবাসন-অবস্থা না থাকা ব্যক্তিদের জন্য ৩৪৬টি ফৌজদারি আইনি সহায়তা মঞ্জুর করা হয়। বিদেশি অপরাধীদের আইনি সহায়তায় স্কটিশ করদাতাদের মোট ব্যয় ৫ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আবদুল রহমান মোহাম্মদের ঘটনাও রয়েছে। সোমালীয় এই নাগরিকের বিরুদ্ধে ৩০টি অপরাধের রেকর্ড থাকার কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে মারামারি, ছুরি বহন, হামলা ও ডাকাতির অভিযোগ রয়েছে। ২০০৮ সালে তার বিরুদ্ধে বহিষ্কারের নির্দেশ জারি হলেও সোমালিয়ায় নিরাপত্তাঝুঁকির আশঙ্কায় ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের বিচারকেরা তা আটকে দেন। পরে অবৈধভাবে আটক থাকার ৪৪৫ দিনের জন্য ২০১৭ সালে ব্রিটিশ হোম অফিসকে তাকে ৮০ হাজার পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

আরেক ঘটনায়, মিসরীয় নাগরিক আবদেলরহমান আদনান আবুয়েলেলাকে ২০২৩ সালে আশ্রয়ের আবেদন করার পর পশ্চিম লন্ডনের ইলিংয়ে একটি হিলটন হোটেলে রাখা হয়েছিল বলে জানায় দ্য সান। পরে হাইড পার্কে এক নারীকে ধর্ষণের দায়ে তিনি সাড়ে আট বছরের কারাদণ্ড পান। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এর আগে মিসরে বোমা তৈরির একটি চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অনুপস্থিতিতে তার সাত বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল।

ব্রিটিশ হোম অফিসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অবৈধ ও বিপজ্জনক পথে ব্রিটেনে আসার আকর্ষণ কমাতে ফ্রান্সে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি বাড়ানো হচ্ছে এবং বিদেশি অপরাধীদের বহিষ্কারের কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। সরকারের ক্ষমতায় আসার পর থেকে চলতি বছরের মার্চের শেষ পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার বিদেশি অপরাধীকে ফেরত পাঠানো বা বহিষ্কার করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেশি বলে জানিয়েছে হোম অফিস।

সূত্রঃ দ্য সান

এমকে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে প্রবেশে করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক

যুক্তরাজ্যের অধিকাংশ পেট্রোল পাম্প বন্ধ, পরিস্থিতি সামলাতে প্রস্তুত সেনাবাহিনী

আন্তর্জাতিক দুর্নীতিতে জড়িত ২২ ব্যক্তি যুক্তরাজ্যে নিষিদ্ধ

নিউজ ডেস্ক