ব্রিটেনের ইংল্যান্ডে মানসিক স্বাস্থ্য, অটিজম ও এডিএইচডি চিকিৎসাসেবার চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকায় জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এনএইচএসে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে হাজার হাজার রোগী প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন ও চিকিৎসা পাচ্ছেন না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত এক পর্যালোচনায় দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা, বেসরকারি ক্লিনিকের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো এবং রোগ নির্ণয়ের সনদের পরিবর্তে রোগীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পিটার ফোনাগির নেতৃত্বে পরিচালিত ১০ মাসের এই পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, গত কয়েক দশকে মানসিক স্বাস্থ্য ও স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যার জন্য সহায়তা চাওয়া মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামাল দিতে না পারলে এনএইচএসে ‘ব্যবস্থাগত বিপর্যয়’ দেখা দিতে পারে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ইংল্যান্ডে এডিএইচডি শনাক্তকরণের মূল্যায়নের জন্য অপেক্ষা করছিলেন ৫ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ। ২০১৯ সালের তুলনায় এই সংখ্যা ১৭ গুণ বেশি। একই সময়ে অটিজম শনাক্তকরণের মূল্যায়নের জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫৪ হাজার। সব মিলিয়ে দুই ধরনের মূল্যায়নের জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের সংখ্যা ৮ লাখ ছাড়িয়ে যায়। তাদের প্রায় ৯০ শতাংশকে অন্তত তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে।
ইংল্যান্ডে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার বিস্তারও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ১৯৯৩ সালে ১৬ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের মধ্যে সাধারণ মানসিক সমস্যায় আক্রান্তের হার ছিল ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে ২২ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার আরও দ্রুত বেড়েছে। আগে এই বয়সীদের প্রায় ছয়জনের একজন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় চারজনে একজন হয়েছে।
পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যসংকটকে শুধু সচেতনতা বৃদ্ধি বা ব্যক্তিগত দুর্বলতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। আর্থিক চাপ, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, আবাসনের অতিরিক্ত ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক তরুণের মধ্যে এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে যে, তাদের জীবন মা-বাবার প্রজন্মের তুলনায় ভালো নাও হতে পারে।
পর্যালোচনার সহসভাপতি ও বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সাইমন ওয়েসলি বলেছেন, তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যাকে কল্পিত বা অতিরঞ্জিত বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো ভিত্তি নেই। এসব সমস্যার বাস্তব প্রভাব রয়েছে এবং তা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে।
এদিকে অটিজম ও এডিএইচডি শনাক্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় ভুল রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রোগ নির্ণয়ের ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে সঠিকভাবে রোগ শনাক্ত করতে না পারার পাশাপাশি ভুলভাবে অটিজম বা এডিএইচডি নির্ণয়ের ঝুঁকিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তবে পর্যালোচনায় বলা হয়নি যে ইতিমধ্যে ব্যাপক হারে অতিরিক্ত রোগ নির্ণয় হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগ শনাক্ত করতে ব্যর্থ হওয়া, ভুল রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রোগ নির্ণয়ের ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই মূল্যায়নের মান নিশ্চিত করা এবং রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়ায় আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডে ৬ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে অটিজম শনাক্তের হার প্রায় ২০ গুণ বেড়ে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে। ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার বেড়েছে প্রায় ৪০ গুণ—শূন্য দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ০৬ শতাংশে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে এডিএইচডি শনাক্তের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এনএইচএসে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অনেক মানুষ দ্রুত মূল্যায়নের জন্য বেসরকারি ক্লিনিকে যাচ্ছেন। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে রোগ নির্ণয়ের মান ও ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পর্যালোচনা কমিটি। একই সঙ্গে মূল্যায়নের সংখ্যা বাড়ানোর পেছনে আর্থিক প্রণোদনা কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এ কারণে সব বেসরকারি মূল্যায়ন ক্লিনিককে কেয়ার কোয়ালিটি কমিশনের নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা এবং সাধারণ মানুষের উদ্দেশে সরাসরি বিজ্ঞাপন দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসচিব ইয়েভেট কুপার সব বেসরকারি মূল্যায়ন ক্লিনিককে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি।
পর্যালোচনায় এনএইচএসের সেবাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য ও স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যার চিকিৎসাসেবা সমন্বিত করা এবং আনুষ্ঠানিক রোগ নির্ণয়ের সনদ পাওয়ার ওপর চিকিৎসা নির্ভরশীল না রাখা। অর্থাৎ, অটিজম বা এডিএইচডি শনাক্তের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হলেও যাদের চিকিৎসা ও সহায়তা প্রয়োজন, তাদের যেন সেবা থেকে বঞ্চিত হতে না হয়।
রয়্যাল কলেজ অব পেডিয়াট্রিকস অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ এই সুপারিশকে সমর্থন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা চিকিৎসক রনি চিউং বলেছেন, অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর সহায়তা পাওয়ার একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে আনুষ্ঠানিক রোগ নির্ণয়। ফলে মূল্যায়নের জন্য অপেক্ষা করার সময় শিশু ও তাদের পরিবার প্রয়োজনীয় সহায়তা ছাড়াই সংকটে পড়ে থাকে।
প্রতিবেদনে আরও আশঙ্কা করা হয়েছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ইংল্যান্ডে উচ্চমাত্রার মানসিক চাপে থাকা শিশুর সংখ্যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ লাখ থেকে বেড়ে সাড়ে ৪০ লাখে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে আত্মক্ষতিমূলক আচরণে জড়িত ১৮ বছরের কম বয়সীদের সংখ্যা ১৯ লাখ থেকে বেড়ে ২৫ লাখ হতে পারে।
স্বাস্থ্যসচিব ইয়েভেট কুপার জানিয়েছেন, বছরের শেষ নাগাদ প্রকাশিতব্য সরকারের নতুন মানসিক স্বাস্থ্য কৌশল নির্ধারণে এই পর্যালোচনার সুপারিশগুলো বিবেচনা করা হবে। তিনি এনএইচএসকে দ্রুত পরামর্শ, মূল্যায়ন ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার উপায় নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন। তার মতে, তরুণদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে ধরে রাখতে এবং তাদের জীবন স্বাভাবিক রাখতে প্রাথমিক পর্যায়েই মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এমকে

