ব্রিটেনে প্রস্তাবিত নতুন ট্রান্সজেন্ডার আইনে কর্মীদের সম্বোধনের ক্ষেত্রে ভুল সর্বনাম (Pronoun) ব্যবহার নিয়ে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কারাদণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সমালোচকরা। খসড়া আইনে নির্দিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং সীমাহীন জরিমানার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ব্রিটিশ সরকারের প্রস্তাবিত ‘ড্রাফট কনভার্সন প্র্যাকটিসেস বিল’-এর আওতায় কোনো ব্যক্তির যৌন অভিমুখিতা বা লিঙ্গপরিচয় জোরপূর্বক পরিবর্তন কিংবা দমন করার প্রচেষ্টাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। তবে আইনটির পরিধি এবং এর প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অধিকারকর্মী ও আইনটির সমালোচকরা।
খসড়া বিল অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, ব্যবস্থাপক, কোম্পানি সচিব, অংশীদার এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মতো দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও আইনি দায়ের মুখে পড়তে পারেন। প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অপরাধ সংঘটনে অনুমোদন দেওয়া বা সরাসরি অংশ নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ ঠেকাতে ‘সব যুক্তিসংগত পদক্ষেপ’ গ্রহণে ব্যর্থ হলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সীমাহীন জরিমানার মুখেও পড়তে হতে পারে।
তবে ব্রিটিশ সরকারের দাবি, এই বিধান মূলত কনভার্সন থেরাপি বা জোরপূর্বক যৌন অভিমুখিতা ও লিঙ্গপরিচয় পরিবর্তনের প্রচেষ্টায় জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। সাধারণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মক্ষেত্রে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনাকারীদের লক্ষ্য করে এই আইন তৈরি করা হয়নি।
সরকারের প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন আইন বাস্তবায়নে আগামী ১০ বছরে বেসরকারি খাতের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ১ কোটি ৩৬ লাখ পাউন্ড ব্যয় হতে পারে। একই সময়ে সরকারি খাতে অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ড। সব মিলিয়ে সম্ভাব্য ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড।
ব্যয়ের হিসাবে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়তে পারে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৯১ লাখ পাউন্ড। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতে ৩৮ লাখ পাউন্ড, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ৭ লাখ পাউন্ড এবং এলজিবিটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর জন্য প্রায় ৫০ হাজার পাউন্ড ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়েছে।
আইনটির ভাষা অতিরিক্ত বিস্তৃত বলে সমালোচনা করেছেন সাবেক সমতা ও মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ব্যারনেস ফকনার। পলিসি এক্সচেঞ্জ থিংকট্যাংকের জন্য লেখা এক প্রতিবেদনে তিনি বলেন, আইনে ‘সব যুক্তিসংগত পদক্ষেপ’ গ্রহণের যে বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে, বাস্তবে এর অর্থ কী হবে তা স্পষ্ট নয়।
তার মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা অপরাধ প্রতিরোধে নিজের বিবেচনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরও অন্য কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন। অথচ খসড়া আইনে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া বাধ্যতামূলক, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আইনটির সুযোগ নিয়ে জেন্ডার-সংক্রান্ত বিষয়ে ভিন্নমত পোষণকারী সংগঠনগুলোর প্রকাশিত বক্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে মামলা করা হতে পারে।
এদিকে, সংস্থাটির অ্যাডভোকেসি পরিচালক হেলেন জয়েসের দাবি, নতুন আইন নিয়োগকর্তাদের পরস্পরবিরোধী আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে ফেলতে পারে। তার মতে, কর্মক্ষেত্রে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের জন্য নারী-পুরুষের পৃথক সুবিধা ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো আইনি জটিলতায় পড়তে পারে।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ সরকার এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের এক মুখপাত্র বলেছেন, এই বিল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে—এমন দাবি সম্পূর্ণ অসত্য, যদি না কোনো প্রতিষ্ঠান অপব্যবহারমূলক কনভার্সন প্র্যাকটিসেসের সঙ্গে জড়িত থাকে।
সরকারের বক্তব্য, নতুন অপরাধমূলক আইন কার্যকর হলে সামাজিক কর্মী ও শিক্ষকদের মতো সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণ এবং নির্দেশিকা হালনাগাদ করার জন্য সামান্য কিছু ব্যয় হতে পারে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, তারা যেন নির্যাতন বা অপব্যবহার শনাক্ত করতে এবং ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারেন।
সূত্রঃ জিবি নিউজন
এমকে

