ব্রিটেনে যৌনবাহিত শিগেলোসিস সংক্রমণ বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। শিগেলা নামের ব্যাকটেরিয়ায় সৃষ্ট এই সংক্রমণে তীব্র ডায়রিয়া, পেটব্যথা, জ্বর, বমি এবং মলের সঙ্গে রক্তপাত হতে পারে। গবেষকদের আশঙ্কা, সংক্রমণ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে ক্রমেই প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করায় কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ছে।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে সম্ভাব্য যৌনবাহিত শিগেলা সংক্রমণের শনাক্তের সংখ্যা ২০২৪ সালের ২ হাজার ৫২ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২ হাজার ৫৬০ হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে প্রায় ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এসব সংক্রমণের অর্ধেকেরও বেশি লন্ডনে শনাক্ত হয়েছে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি দ্য ল্যানসেট ইনফেকশাস ডিজিজেস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে ২০০৪ সাল থেকে ২০২০ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত যুক্তরাজ্যজুড়ে সংগ্রহ করা শিগেলা সোনেই ব্যাকটেরিয়ার ৩ হাজার ৫১৪টি নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। বিশ্লেষণে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সংক্রমণ পুরুষের সঙ্গে পুরুষের যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা হয়। গবেষণায় আরও দেখা যায়, যৌনবাহিত সংক্রমণ অন্যান্য ধরনের সংক্রমণের তুলনায় দ্রুত ছড়াতে পারে এবং ভৌগোলিকভাবে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে।
শিগেলোসিস সাধারণত দূষিত খাবার খাওয়া, আক্রান্ত ব্যক্তির মলের সংস্পর্শে আসা কিংবা দূষিত পৃষ্ঠ স্পর্শ করার মাধ্যমে ছড়ায়। তবে যৌনসম্পর্কের সময় মলের অতি ক্ষুদ্র কণার সংস্পর্শ থেকেও সংক্রমণ ঘটতে পারে। বিশেষ করে পায়ুপথে যৌনসম্পর্কের সময় সরাসরি বা হাত ও যৌনসামগ্রীর মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যৌনবাহিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে সিপ্রোফ্লক্সাসিন, অ্যাজিথ্রোমাইসিন ও সেফট্রিয়াক্সোনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা বেশি। যৌনবাহিত সংক্রমণের প্রায় ১০টির মধ্যে ৭টি ক্ষেত্রে অন্তত একটি ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা পাওয়া গেছে। অন্য পথে সংক্রমিতদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ১০টির মধ্যে ৪টি এবং ভ্রমণ-সম্পর্কিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে প্রায় অর্ধেক।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাটির জ্যেষ্ঠ লেখক অধ্যাপক কেট বেকার বলেন, যৌনবাহিত শিগেলোসিসের চিকিৎসা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে, কারণ ব্যাকটেরিয়াগুলো অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করছে। তিনি জানান, সংক্রমণ গুরুতর হলে রোগী এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় অসুস্থ থাকতে পারেন। কিছু রোগীর তীব্র পেট মোচড়ানো ব্যথা ও মলের সঙ্গে রক্তপাত হতে পারে। প্রাদুর্ভাবের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু ঘটনায় এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত রোগীকে চার থেকে পাঁচ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ শিগেলোসিস প্রতিরোধে হাত ধোয়া ও খাবারের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হলেও যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে সংক্রমণ ঠেকাতে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। অধ্যাপক বেকার বলেন, পেটের সংক্রমণকে শুধু সাধারণ খাদ্যে বিষক্রিয়া ভেবে উপেক্ষা করা উচিত নয়। সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকলে যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে অন্যের শরীরে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে—এ বিষয়েও সচেতন থাকা প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থার পরামর্শক মহামারিবিদ ডা. হ্যামিশ মোহাম্মদ জানান, যৌনবাহিত শিগেলা সংক্রমণ প্রধানত সমকামী ও উভকামী পুরুষদের মধ্যে দেখা যায়। জ্বর, পেটব্যথা ও তীব্র ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে পরীক্ষা করানো জরুরি। শিগেলা শনাক্ত হলে এইচআইভিসহ অন্যান্য যৌনবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি যাচাই করতে যৌনস্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোরও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, যৌনসম্পর্কের আগে ও পরে ভালোভাবে হাত পরিষ্কার করা, যৌনসামগ্রী ধোয়া, পায়ুপথ ও মুখের যৌনসম্পর্কের মধ্যে কনডম পরিবর্তন করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সুরক্ষামূলক বাধা ব্যবহার সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। সংক্রমণের উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং সুস্থ হওয়ার পরও সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি।
সূত্রঃ ডেইলি মেইল
এমকে

