21.8 C
London
September 19, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রিটেনে ৪০টির বেশি পুলিশ বাহিনীর তথ্য মাইক্রোসফটের ক্লাউডেঃ নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

ব্রিটেনের ৪০টির বেশি পুলিশ বাহিনীর বিপুল পরিমাণ সংবেদনশীল তথ্য মাইক্রোসফটের ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম অ্যাজুরে (Azure) সংরক্ষিত রয়েছে। তবে ২০১৭ সালে করা একটি সরকারি নিরাপত্তা মূল্যায়নে সতর্ক করা হয়েছিল, এই ব্যবস্থায় থাকা পুলিশি তথ্য বিদেশি পক্ষ, সাইবার হামলাকারী এবং এমনকি মার্কিন সরকারের অভ্যন্তরীণ কোনো পক্ষের মাধ্যমে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান।

দ্য গার্ডিয়ানের হাতে আসা পুলিশি নথি অনুযায়ী, অ্যাজুরে থাকা তথ্যের মধ্যে রয়েছে অপরাধের রেকর্ড, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, গোয়েন্দা তথ্য, মামলার নথি, অভ্যন্তরীণ ই-মেইল, শরীরে পরিধানযোগ্য ক্যামেরার ভিডিও এবং ডিজিটাল প্রমাণ। নথিতে আরও বলা হয়েছে, এসব তথ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্রিটিশ সরকারের ‘অফিশিয়াল’ শ্রেণিবিন্যাসের চেয়েও বেশি সংবেদনশীল হতে পারে।

২০১৭ সালে ব্রিটিশ পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা মাইক্রোসফটের বৈশ্বিক ক্লাউডে পুলিশের তথ্য স্থানান্তরের সঙ্গে যুক্ত ১৫টি ঝুঁকি পর্যালোচনা করেছিলেন। ওই বৈঠকের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন সিটি অব লন্ডন পুলিশের কমিশনার ও ব্রিটেনের পুলিশের জ্যেষ্ঠ তথ্য-ঝুঁকি কর্মকর্তা ইয়ান ডাইসন।

মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, মাইক্রোসফটের সফটওয়্যারে এমন দুর্বলতা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে সাইবার অপরাধী ও অন্যান্য হামলাকারীরা কাজে লাগাতে পারে। একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীগুলো সবসময় নিশ্চিতভাবে জানতে পারবে না তাদের তথ্য কোথায় প্রক্রিয়াজাত বা সংরক্ষিত হচ্ছে।

নথিতে আরও বলা হয়েছিল, মাইক্রোসফটের ক্লাউড অবকাঠামোর বৈশ্বিক প্রকৃতির কারণে পুলিশের তথ্য ও সেই তথ্য-সংক্রান্ত মেটাডেটা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো বা সংরক্ষণ করা হতে পারে এবং এর সম্পূর্ণ পরিধি জানা নাও থাকতে পারে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্বেগগুলোর একটি ছিল ‘মার্কিন সরকারের অভ্যন্তরীণ হামলাকারী’। মূল্যায়নে আশঙ্কা করা হয়েছিল, মাইক্রোসফটের কাছে থাকা বা মাইক্রোসফটের কাছ থেকে নেওয়া সংবেদনশীল তথ্য কোনো মার্কিন সরকারি অভ্যন্তরীণ পক্ষের মাধ্যমে ফাঁস হতে পারে।

ঝুঁকি কমাতে সে সময় পুলিশ বাহিনীগুলোকে সফটওয়্যার ও সার্ভার নিয়মিত হালনাগাদ রাখা, অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার এবং মাইক্রোসফটের নিজস্ব এনক্রিপশন প্রযুক্তি প্রয়োগের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

তবে দ্য গার্ডিয়ানের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন ক্লাউড প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের মতে, এসব ব্যবস্থা বিদেশি অ্যাক্সেসের সম্ভাব্য ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে পারে না। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাইক্রোসফটের অভ্যন্তরীণ এনক্রিপশন কর্মীদের সম্ভাব্য অ্যাক্সেস পুরোপুরি বন্ধ করে না এবং বিদেশি কর্তৃপক্ষের আইনগত ক্ষমতার বিষয়টিও আলাদা ঝুঁকি তৈরি করে।

বর্তমানে ব্রিটেনের পুলিশিং অবকাঠামোয় মাইক্রোসফট অ্যাজুরের ব্যবহার আরও বিস্তৃত হয়েছে। পুলিশ ডিজিটাল সার্ভিস (পিডিএস) জানিয়েছে, ন্যাশনাল পুলিশ ক্যাপাবিলিটিজ এনভায়রনমেন্ট (এনপিসিই) নামে ব্রিটিশ পুলিশের জন্য একটি জাতীয়ভাবে অনুমোদিত ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম মাইক্রোসফট অ্যাজুরের ওপর তৈরি করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে এই প্রকল্প পূর্ণ কার্যক্ষমতায় পৌঁছায়।

পুলিশ ডিজিটাল সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের পুলিশ বাহিনীগুলোর বিভিন্ন ডিজিটাল অ্যাপ্লিকেশন ও সেবা পরিচালনা করা হচ্ছে। প্ল্যাটফর্মটিতে সাইবার প্রতিরক্ষা, হুমকি শনাক্তকরণ এবং ঘটনা মোকাবিলার ব্যবস্থাও রয়েছে।

তবে দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তথ্য কোথায় শারীরিকভাবে সংরক্ষিত রয়েছে—তার পাশাপাশি কারা সেই তথ্য পরিচালনাকারী ক্লাউড ব্যবস্থায় অ্যাক্সেস করতে পারেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ক্লাউড প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোসফটের বৈশ্বিক অবকাঠামো পরিচালনায় বিভিন্ন দেশের কর্মী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীরা যুক্ত থাকেন। ফলে শুধু ব্রিটেনের ডেটা সেন্টারে তথ্য রাখা হলেই আন্তর্জাতিক অ্যাক্সেসের সব সম্ভাব্য ঝুঁকি দূর হয় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এনপিসিসি জানিয়েছে, ক্লাউডে সংরক্ষিত পুলিশি তথ্যের অ্যাক্সেস প্রকৃত প্রয়োজন থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং এ ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মাইক্রোসফটের সঙ্গে করা চুক্তির আওতায় ব্রিটিশ সরকারের স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া মার্কিন সরকারের কাছে তথ্য সরবরাহ প্রত্যাশিত নয়।

মাইক্রোসফটও বলেছে, তাদের ক্লাউড সেবা ব্যবহার করলেই গ্রাহকের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনিরাপদ হয়ে যায় বা বিদেশি সরকারের কাছে উন্মুক্ত হয়—এমন ধারণা সঠিক নয়। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কোনো সরকারকে গ্রাহকের তথ্যের সরাসরি বা সীমাহীন অ্যাক্সেস দেওয়া হয় না এবং তারা কোনো মার্কিন বা বৈশ্বিক কর্তৃপক্ষের অনুরোধের জবাবে ব্রিটিশ সরকারের তথ্য সরবরাহ করেনি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাউড অ্যাক্ট (CLOUD Act) নিয়েও আইনগত প্রশ্ন রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছে বিদেশে সংরক্ষিত তথ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন আইন কীভাবে প্রয়োগ হতে পারে, তা নিয়ে তথ্য-সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তৈরি হয়।

এদিকে মাইক্রোসফট জানিয়েছে, বিদেশি কোনো কর্তৃপক্ষের তথ্য চাওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় এবং ব্রিটিশ আইন যদি অন্য কোনো সরকারের কাছে তথ্য হস্তান্তর নিষিদ্ধ করে, তাহলে সেই আইনই তাদের প্রতিক্রিয়া নির্ধারণ করবে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০১৭ সালের মূল্যায়নে যে ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেগুলোর কারণে ব্রিটিশ পুলিশের তথ্য ইতোমধ্যে চুরি বা বেআইনিভাবে বিদেশি কোনো পক্ষের হাতে গেছে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বিষয়টিকে নিশ্চিত তথ্য ফাঁসের ঘটনা নয়, বরং সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

একই সঙ্গে পুলিশের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ক্লাউড ব্যবস্থায় থাকা লগ ও অন্যান্য তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো অননুমোদিত অ্যাক্সেস ঘটেছে কি না, তা সবসময় নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব নাও হতে পারে।

ব্রিটিশ সরকারের প্রযুক্তি অবকাঠামোর বৃহত্তর চিত্রেও মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ সরকারের বিপুল পরিমাণ তথ্য ও ডিজিটাল অবকাঠামো বড় মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ক্লাউড সেবার ওপর নির্ভরশীল। ফলে পুলিশের তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে এই বিতর্ক এখন সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড প্রযুক্তি এবং তথ্য-সার্বভৌমত্ব নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান \ ব্রিটেনের পুলিশ ডিজিটাল সার্ভিস (পিডিএস)

এমকে

আরো পড়ুন

প্রধানমন্ত্রী হবার জরিপে অনেক পিছিয়ে পড়েছেন ঋষি সুনাক

নিউজ ডেস্ক

অবশেষে সিলেটের শত কোটি টাকার বাড়ির রহস্য উদ্ধার

পূর্ব লন্ডনের মাইল এন্ডে ভাইয়ের হাতে ভাই খুনঃ পারিবারিক দ্বন্দ্বের মর্মান্তিক পরিণতি