ব্রিটেনে ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে অপরাধে জড়িত ইইউ নাগরিকদের বহিষ্কারের ক্ষেত্রে ‘অনুপাতিকতা’ বা প্রোপোরশনালিটি বিবেচনা করা বাধ্যতামূলক কি না—এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি করতে যাচ্ছে ব্রিটিশ সুপ্রিম কোর্ট। মামলাটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার পরও কিছু ইইউ নাগরিকের জন্য বহাল থাকা অধিকার ও সুরক্ষার ব্যাখ্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
মামলাটির নাম ভার্গোভা বনাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী— Vargova v Secretary of State for the Home Department—এবং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মলনার বনাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী—Molnar v Secretary of State for the Home Department। ব্রিটিশ সুপ্রিম কোর্টের নথি অনুযায়ী, দুই মামলাতেই আপিলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং পূর্ণাঙ্গ শুনানি নির্ধারিত হয়েছে ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি ২০২৭।
মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ব্রেক্সিটের পর অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর ২০২০-এর পর সংঘটিত অপরাধের ভিত্তিতে কোনো ইইউ নাগরিককে ব্রিটেন থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে সেই বহিষ্কার ‘অনুপাতিক’ কি না, তা বিবেচনা করতে হবে কি না।
মামলার দুই আপিলকারী কাতারিনা ভার্গোভা এবং মলনার—দুজনই ইইউ নাগরিক এবং দুজনেরই ব্রিটেনে আইএলআর (ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন) রয়েছে। দুজনের অপরাধই ৩১ ডিসেম্বর ২০২০-এর পর সংঘটিত হয় এবং দুজনই ১২ মাসের বেশি কারাদণ্ড পান।
কাতারিনা ভার্গোভা—স্লোভাকিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০০৭ সালে ২১ বছর বয়সে ব্রিটেনে আসেন। ২০২১ সালের ৫ জানুয়ারি তাকে আইএলআর দেওয়া হয়। ব্রিটিশ সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তিনি প্রায় ১৫ বছর ধরে ব্রিটেনে বসবাস করছিলেন। ২০২২ সালে তিনি কোকেন ও হেরোইন সরবরাহের উদ্দেশ্যে রাখার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন।
অন্য আপিলকারী মলনার—২০০২ সালে চেক প্রজাতন্ত্রে জন্মগ্রহণ করেন। ২০১২ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে ব্রিটেনে আসেন। ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর তাকে আইএলআর দেওয়া হয়। ২০২২ সালে তিনি সরবরাহের উদ্দেশ্যে কোকেন রাখা, অপরাধলব্ধ সম্পত্তি এবং একটি ‘নাকলডাস্টার’ রাখার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন।
দুই মামলাতেই ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী তাদের বহিষ্কারের পৃথক সিদ্ধান্ত নেন। তারা সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফার্স্ট-টিয়ার ট্রাইব্যুনালে আপিল করেন। ট্রাইব্যুনাল তাদের আপিল মঞ্জুর করে এবং বলে, বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাদের বহিষ্কার অনুপাতিক কি না, তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বিবেচনা করেননি।
পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আপার ট্রাইব্যুনালে আপিল করেন। আপার ট্রাইব্যুনাল সেই আপিল গ্রহণ করে এবং জানায়, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে আলাদা কোনো অনুপাতিকতার পরীক্ষা প্রযোজ্য নয়। এরপর ভার্গোভা ও মলনার কোর্ট অব আপিলে যান। কোর্ট অব আপিলও তাদের আপিল খারিজ করে। এরপর তারা সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার অনুমতি চান এবং ২৯ জুন ২০২৬ তাদের সেই অনুমতি দেওয়া হয়।
এই মামলায় ব্রেক্সিট-পরবর্তী উইথড্রয়াল অ্যাগ্রিমেন্ট বা ব্রিটেন-ইইউ বিচ্ছেদ চুক্তির অধীনে থাকা অধিকারগুলোর ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মূল প্রশ্নগুলোর একটি হলো, ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে সংঘটিত অপরাধের কারণে বহিষ্কারের ক্ষেত্রে জাতীয় ব্রিটিশ আইনই কি একমাত্র আইনি কাঠামো হিসেবে প্রযোজ্য হবে, নাকি উইথড্রয়াল অ্যাগ্রিমেন্টের অধীনে থাকা কিছু ইউরোপীয় আইনি সুরক্ষাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
এর আগে নিম্ন আদালতগুলোতে এ নিয়ে ভিন্ন অবস্থান উঠে আসে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত নির্দেশিকার কিছু সুরক্ষা উইথড্রয়াল অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে কার্যকর থাকার বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ইইউ সেটেলমেন্ট স্কিমের অধীনে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের অধিকার। ইমিগ্রেশন (সিটিজেনস’ রাইটস আপিলস) (ইইউ এক্সিট) রেগুলেশনস ২০২০-এর রেগুলেশন ৬-এর অধীনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আপিলের সুযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৫ জুন রেগুলেশন ৬-এ নতুন ৬(১এ) ধারা যুক্ত করা হয়, যেখানে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের সংজ্ঞা আরও নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
আইনি বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় ‘স্টেজ ওয়ান’ এবং ‘স্টেজ টু’ সিদ্ধান্তের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো ইইউ নাগরিককে বহিষ্কারের প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর পরবর্তী পর্যায়ে মানবাধিকার দাবি প্রত্যাখ্যানসহ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রেগুলেশন ৬-এর আপিলের অধিকার রয়েছে কি না, তা সঠিকভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তার কথা মামলার আলোচনায় উঠে এসেছে।
এ ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটনের সঠিক তারিখও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কারও বিরুদ্ধে পরে সাজা দেওয়া হলেও যদি সংশ্লিষ্ট অপরাধটি ৩১ ডিসেম্বর ২০২০-এর আগে সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে তার ক্ষেত্রে ব্রেক্সিট-পরবর্তী অপরাধের নিয়ম সরাসরি প্রযোজ্য নাও হতে পারে। তাই মামলায় অপরাধের মূল তারিখ যাচাই করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
ব্রিটিশ সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আদালতের সামনে এখন মূল আইনি প্রশ্ন হলো—ব্রেক্সিটের পর সংঘটিত অপরাধের ভিত্তিতে কোনো ইইউ নাগরিককে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অনুপাতিকতার প্রশ্ন বিবেচনা করা আবশ্যক কি না।
সুপ্রিম কোর্টের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি ২০২৭। এই শুনানিতে আদালত কেবল ভার্গোভা ও মলনার ব্যক্তিগত মামলার বিষয়ই নয়, বরং ব্রেক্সিট-পরবর্তী ইইউ নাগরিকদের অধিকার, উইথড্রয়াল অ্যাগ্রিমেন্ট এবং বহিষ্কার আইনের মধ্যে সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারে।
তবে সুপ্রিম কোর্ট এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। ফলে ইইউ নাগরিকদের বহিষ্কারের ক্ষেত্রে অনুপাতিকতার পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হবে কি না, কিংবা এই মামলার রায় ভবিষ্যতের অনুরূপ মামলায় কী প্রভাব ফেলবে—তা ২০২৭ সালের শুনানি ও পরবর্তী রায়ের ওপর নির্ভর করছে।
সূত্রঃ ফ্রি মুভমেন্ট
এম.কে

