20.5 C
London
September 15, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

ব্রেক্সিটে হতাশ ব্রিটিশ জেলেরাঃ রপ্তানি জটিলতা ও মজুত নিয়ে চাপে মৎস্য খাত

ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ব্রিটেনের মাছ ধরার খাতকে ঘিরে যে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা ও জলসীমার ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার সবগুলো প্রত্যাশা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয়নি বলে দ্য ইকোনমিস্ট-এর ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। জলসীমায় ইইউর মাছ ধরার নৌযানের উপস্থিতি, প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত কোটা বৃদ্ধি, ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানির নতুন প্রশাসনিক জটিলতা এবং মাছের মজুত নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে ব্রেক্সিট-পরবর্তী বাস্তবতা নিয়ে ব্রিটিশ জেলেদের মধ্যে হতাশার বিষয়টি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

ব্রেক্সিটের পক্ষে প্রচারণার সময় ব্রিটিশ জলসীমার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। বিশেষ করে উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এলাকায় ব্রিটিশ জেলেদের জন্য একচেটিয়া প্রবেশাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তবে ২০২০ সালের ব্রেক্সিট বাণিজ্য চুক্তির পরও কিছু ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌযান ব্রিটেনের উপকূলীয় জলসীমায় মাছ ধরার সুযোগ ধরে রাখে। রয়টার্সের প্রতিবেদনেও ব্রিটিশ জেলেদের এ নিয়ে হতাশার কথা উঠে এসেছিল।

মাছ ধরার কোটা নিয়েও ব্রেক্সিট-পূর্ব প্রত্যাশা এবং পরবর্তী বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ব্রিটিশ মৎস্য খাতের পক্ষ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনায় নিজেদের জেলেদের জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি মাছ ধরার অধিকার দাবি করা হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত ব্যবস্থায় কোটা বৃদ্ধির পরিমাণ সেই প্রাথমিক প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত ছিল বলে দ্য ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্য যে নিজস্ব মাছ ধরার সুযোগ পেয়েছে, সেটিও সরকারি পরিসংখ্যানে উল্লেখ রয়েছে। ২০২৫ সালের জন্য যুক্তরাজ্য সরকার ইইউ ও নরওয়ের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে উত্তর সাগর ও আশপাশের জলসীমায় প্রায় ৩ লাখ টন মাছ ধরার সুযোগ নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছিল। এসব কোটার ঐতিহাসিক অবতরণমূল্যের ভিত্তিতে মূল্য প্রায় ৩১০ মিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে বলে সরকার জানিয়েছিল।

মাছ ধরার পাশাপাশি রপ্তানি ব্যবস্থাও ব্রিটিশ জেলেদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্যের নৌযানগুলো যেসব মাছ বেশি ধরে, তার মধ্যে মাকারেল ও হেরিংয়ের মতো প্রজাতির ইউরোপীয় বাজারে চাহিদা রয়েছে। অন্যদিকে ব্রিটিশ ভোক্তাদের মধ্যে কডের মতো কিছু মাছের চাহিদা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় দেশীয় বাজার সব ধরনের মাছের জন্য একই মাত্রার বড় বাজার নয়।

ফলে ব্রিটিশ মাছ ধরার শিল্পের একটি অংশ ইউরোপীয় বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ব্রেক্সিটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় মাছ রপ্তানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাস্টমস নথি, স্বাস্থ্য সনদ ও অন্যান্য সীমান্ত-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া যুক্ত হয়েছে। এ কারণে রপ্তানিকারকদের জন্য প্রশাসনিক ব্যয় ও সময় বেড়েছে বলে বিভিন্ন শিল্প বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

২০২০ সালের শেষে স্বাক্ষরিত যুক্তরাজ্য-ইইউ ট্রেড অ্যান্ড কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট ব্রেক্সিট-পরবর্তী বাণিজ্য সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে। চুক্তিতে পণ্য বাণিজ্যে শুল্ক ও কোটা না থাকার ব্যবস্থা থাকলেও নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে উৎসের নিয়ম এবং সীমান্ত-সংক্রান্ত শর্ত মানতে হয়। মাছ ধরার বিষয়েও যুক্তরাজ্য ও ইইউর মধ্যে পৃথক ব্যবস্থাপনা কাঠামো রাখা হয়েছে।

মৎস্যসম্পদের স্থায়িত্ব নিয়েও আলোচনা রয়েছে। মাছ ধরার কোটা নির্ধারণে মাছের মজুত সংরক্ষণ এবং জেলেদের অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, তাদের মাছ ধরার সুযোগ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক গবেষণা পরিষদ বা আইসিইএসের বৈজ্ঞানিক পরামর্শকে ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হয় এবং যেখানে সম্ভব সেই পরামর্শ অনুযায়ী বা তার নিচে ধরার সীমা নির্ধারণ করা হয়।

২০২৫ সালের উত্তর সাগর চুক্তিতে কড, হ্যাডক, হেরিং, প্লেইস, সাইথ ও হোয়াইটিংসহ ছয়টি মাছের মজুতের জন্য ধরার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর সাগরের কডের ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের তুলনায় মোট অনুমোদিত ধরার সীমা ২০ শতাংশ কমিয়ে ২৫ হাজার ২৮ টন করা হয়েছিল।

তবে দ্য ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণে মাছের মজুত নিয়ে আরও বিস্তৃত উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রেক্সিটের পরও যুক্তরাজ্যের জলসীমায় কিছু মাছের প্রজাতি চাপের মধ্যে রয়েছে এবং সব ক্ষেত্রে মাছের মজুত পুনরুদ্ধারের জন্য পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি।

ব্রেক্সিটের সময় মাছ ধরার খাতকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার অন্যতম প্রতীকী ক্ষেত্র হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল। যুক্তরাজ্যের জলসীমায় ব্রিটিশ নৌযানের জন্য বেশি অধিকার এবং মাছ ধরার খাতের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্রেক্সিটের পর বাস্তব ব্যবস্থায় ইইউর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা, কোটা বণ্টন এবং ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের প্রয়োজনীয়তা অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে যুক্তরাজ্য ও ইইউর মধ্যে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ব্রেক্সিটের পরও দুই পক্ষকে অভিন্ন মাছের মজুত, কোটা ও সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করতে হচ্ছে। যুক্তরাজ্য সরকারও প্রতিবছর ইইউ ও নরওয়ের সঙ্গে মাছ ধরার সুযোগ নিয়ে আলোচনা করে।

ফলে ব্রেক্সিট ব্রিটিশ মৎস্য খাতকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাধারণ মৎস্যনীতি থেকে বের করে নিজস্ব নীতি নির্ধারণের সুযোগ দিলেও, বাস্তবে ইউরোপীয় বাজার, অভিন্ন মাছের মজুত এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি।

দ্য ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণের মূল বিষয় হলো, ব্রেক্সিটের সময় যে প্রত্যাশা তৈরি করা হয়েছিল এবং ব্রিটিশ জেলেরা বর্তমানে যে বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন—দুইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। জলসীমায় নিয়ন্ত্রণ, মাছ ধরার কোটা, রপ্তানি প্রক্রিয়া এবং মাছের মজুত—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্যবস্থার বাস্তব প্রভাব নিয়ে মৎস্য খাতে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

সূত্রঃ দ্য ইকোনমিস্ট

এম.কে

আরো পড়ুন

ব্রিটেনের বিমানবন্দরগুলোতে নতুন ব্যবস্থা

যুক্তরাজ্যে IPP শাস্তি ব্যবস্থা মানবাধিকার লঙ্ঘন, হাজারো কয়েদি আজও বন্দি

লন্ডনে ঐতিহাসিক ‘ব্রিটিশ-বাংলাদেশ ট্রেড সেন্টার’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা

নিউজ ডেস্ক