TV3 BANGLA
বাংলাদেশ

ভারতের ওপর নির্ভরতায় ঝুঁকিতে বাংলাদেশের ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব

দেশে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবার ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের বড় অংশের জন্য এখনো ভারতের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল ক্যাবল বা আইটিসির মাধ্যমে ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানির কারণে গত আট বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৫ কোটি মার্কিন ডলার ভারতে গেছে। একই সঙ্গে ভারতের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রবাহিত হওয়ায় রাষ্ট্রীয়, বাণিজ্যিক ও নাগরিক যোগাযোগের স্পর্শকাতর তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, একটি দেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থা যদি কোনো একটি প্রতিবেশী দেশের অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাদের আশঙ্কা, ভারতের ভূখণ্ড দিয়ে বাংলাদেশি তথ্যের ট্রানজিট হওয়ায় দেশটির বিদ্যমান আইন ও নজরদারি কাঠামোর আওতায় এসব তথ্য বা তথ্যপ্রবাহের কিছু অংশ পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা গত এক দশকে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০১৫ সালে যেখানে দেশে ব্যান্ডউইথের ব্যবহার ছিল প্রায় ১৪১ গিগাবিটস পার সেকেন্ড, ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটস পার সেকেন্ডে। অর্থাৎ ১১ বছরে চাহিদা বেড়েছে ৯৫ গুণেরও বেশি। স্মার্টফোন, উচ্চগতির মোবাইল নেটওয়ার্ক, ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড সেবা ও ডিজিটাল ব্যবসার বিস্তারের সঙ্গে ভবিষ্যতে এই চাহিদা আরও দ্রুত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্ট পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮ সালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা প্রায় ২৭ টেরাবিটস পার সেকেন্ডে পৌঁছাতে পারে। ২০৩০ সালে তা ৫৪ টেরাবিটস, ২০৩২ সালে ১০৮ টেরাবিটস, ২০৩৪ সালে ২১৬ টেরাবিটস এবং ২০৩৬ সালে ৪৩২ টেরাবিটস পর্যন্ত হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণে এখন থেকেই বিকল্প আন্তর্জাতিক সংযোগ ও নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ দুটি সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে সি-মি-উই-৪ থেকে প্রায় ৪ দশমিক ৬ টেরাবিটস এবং সি-মি-উই-৫ থেকে ২ দশমিক ৫ টেরাবিটস ব্যান্ডউইথ পাওয়া যায়। দুই ক্যাবল মিলিয়ে সক্ষমতা প্রায় ৭ দশমিক ১ টেরাবিটস। বিপরীতে বর্তমানে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটস চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ হচ্ছে আইটিসি অপারেটরদের মাধ্যমে।

এ অবস্থায় নতুন সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ দ্রুত নিশ্চিত না হলে আগামী কয়েক বছরে ভারতের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কোনো কারণে আইটিসি সংযোগে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে দেশের আর্থিক লেনদেন, ফ্রিল্যান্সিং, রপ্তানিমুখী শিল্প, সরকারি সেবা এবং সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর আরেকটি উদ্বেগের জায়গা হলো বিদ্যমান সাবমেরিন ক্যাবলগুলোর সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ চাহিদার মধ্যে ব্যবধান। ২০০৫ সালে চালু হওয়া সি-মি-উই-৪-এর নির্ধারিত আয়ুষ্কালও শেষ পর্যায়ে। অন্যদিকে নতুন সি-মি-উই-৬ নিয়ে বিভিন্ন জটিলতার কারণে এর কার্যক্রম শুরু হতে সময় লাগতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতের আইন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইন-২০০০-এর ৬৯ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কম্পিউটার সম্পদ বা সার্ভারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তথ্য নজরদারি, আটক বা ডিক্রিপ্ট করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে ভারতের টেলিযোগাযোগ আইন-২০২৩-এর ২০ ধারায় জননিরাপত্তা বা জরুরি পরিস্থিতিতে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণের বিধান রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেটের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ এনক্রিপ্টেড হলেও শুধু মূল বার্তার বিষয়বস্তুই নিরাপত্তার বিষয় নয়। কে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, কখন যোগাযোগ করছে, কত পরিমাণ তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে এবং কোন আইপি ঠিকানা থেকে যোগাযোগ হচ্ছে—এসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। এসব তথ্যকে কেন্দ্র করে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রীয় সংস্থার যোগাযোগের ধরন বিশ্লেষণ করা সম্ভব বলে তারা মনে করছেন।

এ ছাড়া দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থা বা ভুল নেটওয়ার্ক বিন্যাসের কারণে কিছু তথ্য মাঝপথে বাধাগ্রস্ত বা অন্য পথে পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সীমান্ত গেটওয়ে প্রোটোকল বা বিজিপি-সংক্রান্ত ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থায় কোনো একটি দেশের অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে প্রযুক্তিগত সমস্যার পাশাপাশি কৌশলগত ঝুঁকিও তৈরি হয়।

তবে এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে কিছু ঝুঁকি রয়েছে এবং সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশ নতুন একটি সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছে, যেখান থেকে প্রায় ১৭ টেরাবিটস ব্যান্ডউইথ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি তিনটি কোম্পানি মিলে একটি জোটের মাধ্যমে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল আনার উদ্যোগ নিয়েছে; এ বিষয়েও সরকার কাজ করছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু নতুন ক্যাবল যুক্ত করাই যথেষ্ট নয়; আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের উৎসও বহুমুখী করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে একাধিক সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ তথ্যপ্রবাহ যাতে অপ্রয়োজনে বিদেশি নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে না যায়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

বর্তমানে এশিয়ার অনেক দেশই একাধিক সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য তৈরি করেছে। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের সীমিতসংখ্যক সাবমেরিন সংযোগ এবং আইটিসিনির্ভরতা তাই দীর্ঘমেয়াদে একটি কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল অর্থনীতি যত বড় হবে, তথ্যের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সংযোগের স্বাধীনতাও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তাই ব্যান্ডউইথের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশি কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিরাপদ, বহুমুখী ও নিজস্ব ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলাই বাংলাদেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্রঃ মুসলিম উম্মাহ\ দৈনিক ইনকিলাব

এম.কে

আরো পড়ুন

বাংলাদেশের বাঁধ নির্মাণ, দিল্লিতে নালিশ ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর

বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা বন্ধ করে দিল আরব আমিরাত

টি-২০ তে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টাইগারদের জয়