29.8 C
London
July 10, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

মানবপাচারের শিকারদের সুরক্ষা কমিয়ে আইন ভঙ্গঃ যুক্তরাজ্য সরকারকে কঠোর বার্তা আদালতের

ফ্রান্সের সঙ্গে করা ‘একজনের বদলে একজন’ আশ্রয়প্রার্থী প্রত্যাবাসন চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য মানবপাচারের সম্ভাব্য শিকার ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষা কমানোর সিদ্ধান্তকে বেআইনি ঘোষণা করেছেন যুক্তরাজ্যের হাইকোর্ট। শুক্রবার প্রকাশিত এক রায়ে বিচারপতি শেলডন বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের সংশোধিত নির্দেশিকা আইনসম্মত ছিল না এবং এতে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছিল।

মামলাটি করেন ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো পাঁচজন আশ্রয়প্রার্থী। তাদের মধ্যে চারজন ইরিত্রিয়ার এবং একজন সুদানের নাগরিক। তাদের ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল। তারা আদালতে অভিযোগ করেন, নতুন নির্দেশিকার ফলে মানবপাচারের শিকার হিসেবে সুরক্ষা না পাওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘ রায়ে আদালত বলেন, মানবপাচার-সংক্রান্ত নেতিবাচক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ বাতিল করায় অন্তত দুইজন আশ্রয়প্রার্থীর ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। বিচারপতি শেলডনের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে কোনোভাবেই ‘শক্তিশালী ও কার্যকর’ বলা যায় না। তবে পাঁচটি মামলায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেওয়া অন্যান্য পৃথক সিদ্ধান্তের কিছু অংশ আদালত আইনসম্মত বলে উল্লেখ করেছেন।

বর্তমানে কার্যকর ‘একজনের বদলে একজন’ চুক্তির আওতায় ফ্রান্স থেকে ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে আসা একজন আশ্রয়প্রার্থীকে ফেরত পাঠানোর বিনিময়ে ফ্রান্সে অবস্থানরত এমন একজন আশ্রয়প্রার্থীকে যুক্তরাজ্যে আনা হয়, যিনি ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার চেষ্টা করেননি। সরকার এই নীতির মাধ্যমে ছোট নৌকায় অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকানোর চেষ্টা করছে।

আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্টে কর্মসূচি চালুর পর এক হাজারের বেশি মানুষকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকের অবস্থান এখন অজানা। এছাড়া শত শত আশ্রয়প্রার্থী এখনও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন আটক কেন্দ্রে রয়েছেন এবং তাদেরও ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

সরকার আদালতে যুক্তি দেয়, ফ্রান্স মানবপাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক চুক্তির সদস্য হওয়ায় ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের সুরক্ষার বিষয়টি সেখানে নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে মামলায় উপস্থাপিত প্রমাণে দেখা যায়, ফরাসি নাগরিক নন বা ফ্রান্সের বাইরে মানবপাচারের শিকার হয়েছেন—এমন ব্যক্তিরা ফ্রান্সে একই ধরনের সুরক্ষা পান না, যা যুক্তরাজ্যে মানবপাচারের সব শিকার পেয়ে থাকেন।

মামলার নথিতে আরও উঠে আসে, ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো কিছু আশ্রয়প্রার্থীর থাকার জায়গা নিয়ে সংকট হতে পারে—এ বিষয়েও যুক্তরাজ্য সরকারের কর্মকর্তারা আগে থেকেই অবগত ছিলেন। এমনকি ২০২৫ সালের ১০ জুলাই যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই কর্মকর্তারা জানতেন, লিবিয়ার মতো দেশে মানবপাচারের শিকার হয়ে পরে ফ্রান্সে ফেরত যাওয়া ব্যক্তিরা সমান আইনি সুরক্ষা পাবেন না।

পাঁচজন আবেদনকারীর সবাইকে মামলা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। এর মধ্যে তিনজনকে ইতোমধ্যে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাদের আইনজীবীরা এখন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, বেআইনিভাবে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের পুনরায় যুক্তরাজ্যে ফিরিয়ে আনা হোক।

আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবী এলিজাবেথ কোল বলেন, আদালতের এই রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, সরকারের নীতির কারণে বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ বেআইনিভাবে ফ্রান্সে পাঠানো হয়েছে। তিনি সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক চুক্তি ও দেশীয় আইনের বাধ্যবাধকতা মেনে তাদের ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে আরেক আবেদনকারীর আইনজীবী জুবিয়ের ইয়াজদানি বলেন, পুনর্বিবেচনার সুযোগ মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের জন্য একটি মৌলিক আইনি সুরক্ষা, যা আদালত যথাযথভাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

অভিবাসন আটক ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার সংস্থা মেডিকেল জাস্টিস বলেছে, এই রায় মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের প্রতি সরকারের নীতির গুরুতর দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির মতে, চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রমাণ ও মানবপাচারের অভিযোগ যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে বহিষ্কারের প্রক্রিয়াকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

এই রায়ের ফলে যুক্তরাজ্যের ‘একজনের বদলে একজন’ আশ্রয়প্রার্থী প্রত্যাবাসন কর্মসূচি এবং মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষাবিষয়ক সরকারি নীতির ওপর নতুন করে আইনি ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান

এম.কে

আরো পড়ুন

জুলাইয়ের মধ্যে ভ্যাকসিন পাবেন যুক্তরাজ্যের প্রাপ্তবয়স্ক সবাই

যুক্তরাজ্যের বীমা বাজারে জালিয়াতি, আসছে নতুন ক্র‍্যাকডাউন

ব্রিটেনে মৌসুমের প্রথম শক্তিশালী তুষারঝড়ের সতর্কতা

অনলাইন ডেস্ক