ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণ পেলেও আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যোগ দেবেন কি না, তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি ঢাকা। তবে এরই মধ্যে ভারত সফরের সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে শেখ হাসিনাকে এবং হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ফেরত আনার দাবি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ কিংবা এ উপলক্ষে তার ভারত সফর নিয়ে সরকার এখনো কোনো চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়নি। ফলে মোদীর আমন্ত্রণ থাকলেও তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিশ্চিত হয়েছে—এমন কোনো ঘোষণা এখনো আসেনি। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে অবশ্য ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, শেষ পর্যন্ত তিনি সম্মেলনে যোগ নাও দিতে পারেন।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। এই অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আঞ্চলিক সহযোগিতা, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে ব্রিকসের সদস্য ও আমন্ত্রিত দেশগুলোর সরকারপ্রধানদের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
কিন্তু তারেক রহমান দিল্লি গেলে আলোচনার টেবিলে শুধু ব্রিকস বা আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ই থাকবে না; ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের বেশ কিছু স্পর্শকাতর ইস্যুও সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি এবং হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি।
বাংলাদেশের অবস্থান অনুযায়ী, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ায় দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় তাকে দেশে ফেরত আনার বিষয়টি ঢাকার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে আইনের আওতায় আনার দাবিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য ভারত সফরের ক্ষেত্রে এই দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকায় ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে দুই দেশের বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। তবে সেখান থেকে তারেক রহমানের দিল্লি যাওয়া বা না যাওয়ার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত আসেনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও জানিয়েছেন, ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ এবং ভারত সফর নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অর্থাৎ আমন্ত্রণ পাওয়ার পরও ঢাকা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও মূল্যায়ন চালিয়ে যাচ্ছে।
ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো দীর্ঘদিনের ইস্যুর পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি এখন বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। এর সঙ্গে হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ফেরত দেওয়ার দাবিও যুক্ত হওয়ায় সম্ভাব্য ভারত সফরকে ঘিরে কূটনৈতিক আগ্রহ আরও বেড়েছে।
তবে ভারত এসব বিষয়ে বাংলাদেশের দাবির বিষয়ে কী অবস্থান নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো এবং হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বাংলাদেশে হস্তান্তরের বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা প্রতিশ্রুতির কথা প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।
অন্যদিকে, তারেক রহমানের দিল্লি সফর হলে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে কি না, সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়। কোনো বৈঠকের সময়সূচিও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। ফলে সম্ভাব্য সফর নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জল্পনা থাকলেও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে দুই দেশের সরকারপ্রধান সরাসরি আলোচনায় বসবেন।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে তারেক রহমানের দিল্লি সফরে না যাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সফর বাতিলের ঘোষণা দেয়নি। ফলে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে বাংলাদেশকে কে প্রতিনিধিত্ব করবেন, সেটিও এখনো চূড়ান্ত নয়।
সব মিলিয়ে মোদীর আমন্ত্রণের পরও তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। তবে সফরটি শেষ পর্যন্ত হলে শেখ হাসিনাকে ফেরত আনা এবং হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেতে পারে। আর যদি তারেক রহমান দিল্লি সফর না করেন, সেক্ষেত্রেও এসব ইস্যু নিয়ে ঢাকা-নয়াদিল্লির কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
আগামী সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলন তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক আয়োজন নয়; একই সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের স্পর্শকাতর কয়েকটি ইস্যুতে ঢাকার অবস্থান কতটা দৃঢ় থাকে, সেটিও স্পষ্ট হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্রঃ স্যোশাল মিডিয়া
এম.কে

