কানাডা, ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির কারণে দীর্ঘদিনের মিত্রদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার মধ্যেই তিনি এ আহ্বান জানান।
দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শ্যাম্পেন বলেন, কানাডা, ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের একসঙ্গে কাজ করা উচিত। তার ভাষায়, দেশগুলো স্বাধীন ও সার্বভৌম হলেও একসঙ্গে থাকলে আরও শক্তিশালী হতে পারে। তিনি বলেন, বিশ্ব পরিবর্তিত হয়েছে এবং আমেরিকাও পরিবর্তিত হয়েছে। তাই দেশগুলোকেও নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে।
এরই মধ্যে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন কানাডাকে ইইউর সম্ভাব্য প্রথম ‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’ বা সহযোগী সদস্য করার বিষয়ে আলোচনা শুরুর প্রস্তাব দিয়েছেন।
তবে কানাডা পূর্ণাঙ্গভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করছে না। বরং বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং সরবরাহব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়টি সামনে এসেছে।
কানাডার অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি। দেশটির মোট রপ্তানির ৭০ শতাংশের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে যায়। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির কারণে এই নির্ভরতা কানাডার জন্য নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
কানাডা এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আগামী এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্যান্য দেশের সঙ্গে কানাডার বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশের সঙ্গেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে আগে থেকেই ‘সিইটিএ’ নামে একটি বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, যা ২০১৭ সাল থেকে অস্থায়ীভাবে কার্যকর। নতুন প্রস্তাবটি শুধু শুল্ক কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এগোতে পারে।
সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ডিজিটাল বাণিজ্য, জ্বালানি, মহাকাশ প্রযুক্তি, গবেষণা এবং কর্মী ও শিক্ষার্থীদের চলাচলের বিষয়গুলো আলোচনায় রয়েছে।
তবে ‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’ হিসেবে কানাডার সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়েছে। ইইউর বর্তমান চুক্তিতে এ ধরনের সদস্যপদের কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো নেই। ফলে এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে হলে নতুন করে আলোচনা ও চুক্তির প্রয়োজন হবে এবং ইইউর ২৭ সদস্য দেশের অনুমোদনও লাগতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ হওয়ার উদ্যোগ নিয়ে সতর্ক করেছেন। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কানাডার সঙ্গে ইউরোপের সম্ভাব্য অংশীদারিত্বকে যদি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বৈরী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে।
ইউরোপীয় কমিশনের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়। বরং ইউরোপ ও কানাডার মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোই এর লক্ষ্য।
কানাডার অর্থমন্ত্রী শ্যাম্পেনের বক্তব্যে ব্রিটেনকেও এই বৃহত্তর অংশীদারিত্বের মধ্যে যুক্ত করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। কানাডা ও ব্রিটেনের মধ্যে ইতোমধ্যে ডিজিটাল বাণিজ্য, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে কাজ চলছে।
কানাডা ব্রিটেনের নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট এক্সপেডিশনারি ফোর্সে যোগ দেওয়ার জন্যও আবেদন করেছে। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
শ্যাম্পেনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে কানাডা, ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহব্যবস্থায় সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হতে পারে।
সূত্রঃ রয়টার্স \ এপি
এমকে

