TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যের কট্টর ডানপন্থী নেতা টমি রবিনসনকে যুক্তিতে হারালেন অক্সফোর্ডের মুসলিম শিক্ষার্থী

যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী অক্সফোর্ড ইউনিয়নের এক বহুল আলোচিত বিতর্কে ইসলামবিরোধী অবস্থান নিয়ে অংশ নেওয়া কট্টর ডানপন্থী নেতা টমি রবিনসন এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক ভাষ্যকার লরেন্স ফক্স শেষ পর্যন্ত যুক্তি ও ভোট—দুই ক্ষেত্রেই পরাজিত হয়েছেন। বিতর্কে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলেন গাজার ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মুসলিম শিক্ষার্থী এবং অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সভাপতি আরওয়া এলরায়েস। তার যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য ও পাল্টা প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

গত ১৭ জুন অনুষ্ঠিত এই বিতর্কের বিষয় ছিল—‘পশ্চিমা বিশ্বের ইসলামের প্রতি সন্দিহান হওয়া উচিত।’ প্রস্তাবের পক্ষে ছিলেন টমি রবিনসন ও লরেন্স ফক্স। অন্যদিকে প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নেন সাবেক কনজারভেটিভ মন্ত্রী জ্যাকব রিস-মগ এবং আরওয়া এলরায়েস। বিতর্ক শেষে সদস্যদের ভোটে ৩৩–৩০ এবং চেম্বারের ভোটে ৫৭–৪১ ব্যবধানে ইসলামবিরোধী প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়।

বিতর্ক চলাকালে টমি রবিনসন ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন ধর্মীয় উদ্ধৃতি তুলে ধরে দাবি করেন, ইসলাম অন্য ধর্মের সঙ্গে সহাবস্থানের সুযোগ দেয় না। জবাবে আরওয়া এলরায়েস সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, ধর্মীয় গ্রন্থের বক্তব্য প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে উপস্থাপন করা হচ্ছে কি না। তিনি বলেন, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডকে পুরো মুসলিম সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়। তার ভাষায়, ‘যে গোষ্ঠীগুলো ইসলামের অপব্যাখ্যা করে সহিংসতা ছড়ায়, তাদের নিয়েই সন্দিহান হওয়া উচিত—ইসলাম বা মুসলমানদের নিয়ে নয়।’

তিনি আরও বলেন, ব্রিটিশ মুসলমানরাও উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সমানভাবে অবস্থান নেন এবং অনেক মুসলিম নারী নিজেরাই চরমপন্থার বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। তার এই বক্তব্যে উপস্থিত দর্শকদের ব্যাপক সমর্থন ও করতালি পাওয়া যায়।

অন্যদিকে লরেন্স ফক্স দাবি করেন, ইসলাম কোনো ধর্ম নয়, বরং একটি ‘যুদ্ধযন্ত্রের’ মতো। এরও জোরালো প্রতিবাদ করেন আরওয়া এলরায়েস। তিনি কোরআনের ধর্মীয় সহনশীলতার বিভিন্ন শিক্ষা তুলে ধরে ফক্সের বক্তব্যের অসঙ্গতি তুলে ধরেন।

বিতর্কে আরেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সাবেক কনজারভেটিভ মন্ত্রী জ্যাকব রিস-মগ। তিনি বলেন, কিছু উগ্রপন্থীর কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো মুসলিম সম্প্রদায়কে দায়ী করা যায় না। ব্রিটিশ আইন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী, তাই একটি ধর্মকে সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই এবং শরিয়া আইন ব্রিটিশ আইনের বিকল্প হয়ে যাবে—এমন আশঙ্কাও ভিত্তিহীন।

এই বিতর্ক ঘিরে আগে থেকেই উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। টমি রবিনসনকে আমন্ত্রণ জানানো নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয় এবং শত শত বিক্ষোভকারী অক্সফোর্ড ইউনিয়নের বাইরে অবস্থান নেন। প্রবেশপথ অবরোধের কারণে নির্ধারিত একজন বক্তা ভেতরে ঢুকতে না পারায় শেষ বক্তার দায়িত্বও পালন করেন আরওয়া এলরায়েস। বিতর্ক শুরু হতেও প্রায় ৯০ মিনিট বিলম্ব হয়।

বিতর্কের আগে আরওয়া এলরায়েস বলেছিলেন, দুই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে অক্সফোর্ড ইউনিয়নের উদ্দেশ্য বিতর্কিত মতামতকে অন্ধভাবে প্রচার করা নয়, বরং কঠোর প্রশ্ন ও যুক্তির মাধ্যমে তা যাচাই করা। সেই নীতির বাস্তব প্রতিফলনই দেখা গেছে এই বিতর্কে বলে অনেক পর্যবেক্ষকের মন্তব্য।

বিতর্কের ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর অনেকেই আরওয়া এলরায়েসের প্রশংসা করেছেন। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, একজন মুসলিম শিক্ষার্থী এবং একজন সাবেক রক্ষণশীল মন্ত্রী একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইসলামবিরোধী বক্তব্যকে তথ্য, যুক্তি ও গণতান্ত্রিক বিতর্কের মাধ্যমে কার্যকরভাবে খণ্ডন করেছেন।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিতর্ক শেষে টমি রবিনসন নিজেও মুসলিম বক্তাদের বক্তব্যে ‘নীরবে মুগ্ধ’ হওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফল স্পষ্ট করে দেয়, অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সদস্য ও উপস্থিত দর্শকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ইসলামকে সামগ্রিকভাবে সন্দেহ করার প্রস্তাব সমর্থন করেননি।

সূত্রঃ ফাইভ পিলার’স

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেল বন্ধের ঘোষণায় নানা সংকটে আশ্রয়প্রার্থীদের পরিবার

যুক্তরাজ্যে প্রতি মাসের মর্গেজ বাড়তে পারে ৫০০ পাউন্ড বা তারো বেশি

জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় ব্রিটেনে নাগরিকত্ব আইনে কঠোরতা আনল সরকার