TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য খাতে আন্তর্জাতিক চিকিৎসকদের অবদান বাড়ছেঃ জোরালো হচ্ছে মাননিয়ন্ত্রণের দাবি

যুক্তরাজ্যে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অসদাচরণ মামলায় বিদেশে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের অংশ তাদের সামগ্রিক কর্মসংখ্যার তুলনায় বেশি বলে এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। দ্য টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রমাণিত অসদাচরণের মামলাগুলোর ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশে বিদেশে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকেরা ছিলেন, যেখানে যুক্তরাজ্যে কর্মরত মোট চিকিৎসকের মধ্যে তাদের অংশ ৪২ শতাংশ।

মেডিকেল প্র্যাকটিশনার্স ট্রাইব্যুনাল সার্ভিসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত এক বছরে মোট ২১২ জন চিকিৎসককে অসদাচরণের জন্য দায়ী করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১১৮ জন বিদেশে প্রশিক্ষিত। অর্থাৎ প্রমাণিত অসদাচরণের মামলায় বিদেশে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের সংখ্যা অর্ধেকের বেশি।

এই ১১৮ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ জনকে জেনারেল মেডিকেল কাউন্সিলের (জিএমসি) নিবন্ধন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ৬৯ জনের চিকিৎসা করার লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে, ৯ জনের ওপর নির্দিষ্ট কর্মশর্ত আরোপ করা হয়েছে এবং সাতজনের লাইসেন্স পুনর্বহালের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

বিদেশে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে প্রতারণা ও পেশাগত অদক্ষতার অভিযোগে। এ ছাড়া অপরাধে দণ্ডিত হওয়া এবং যৌন অসদাচরণের অভিযোগেও কয়েকজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শাস্তির মুখে পড়া বিদেশে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলেন ভারতে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক—২৩ জন। এরপর মিশরে প্রশিক্ষিত ১৭ জন চিকিৎসক রয়েছেন।

তবে এই পরিসংখ্যানকে বিদেশি চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে সামগ্রিক অভিযোগের সরল প্রতিফলন হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। জিএমসি জানিয়েছে, বিদেশে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে তুলনামূলক বেশি হারে অভিযোগ আসার পেছনে বৈষম্যের বিষয়টি রয়েছে। সংস্থাটি চলতি বছরের মধ্যে বিদেশি প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হারে অভিযোগের প্রবণতা দূর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যের বাইরে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ৪১৭টি অভিযোগে জিএমসি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করে। এটি ওই বছরের মোট পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ৫৩ দশমিক ৯ শতাংশ। আগের বছর এই হার ছিল ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ।

জিএমসির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে বিদেশে জন্ম নেওয়া চিকিৎসকদের অনুপাত এখন ৪২ শতাংশ। তুলনায় জার্মানিতে এই হার ১৫ শতাংশ এবং ফ্রান্সে ১১ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে বিদেশি চিকিৎসকদের আগমনও বছরে ২০ হাজারের বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে।

প্রতিবেদনে কয়েকটি গুরুতর অসদাচরণের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। মিশরে প্রশিক্ষিত ডা. মোহসেন আলী প্রতারণা ও চিকিৎসায় অনিয়মের অভিযোগে নিবন্ধন হারান। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ক্যানসার রোগীদের ভুয়া চিকিৎসার নামে হাজার হাজার পাউন্ড নিয়েছিলেন।

মিশরে প্রশিক্ষিত আরেক চিকিৎসক ডা. বারাআ আলমাসরি গুরুতর ও অবৈধ শারীরিক অঙ্গহানির কর্মকাণ্ডে জড়িত এক ব্যক্তিকে সহায়তার অভিযোগে চিকিৎসক নিবন্ধন হারান। অন্যদিকে সুদানে প্রশিক্ষিত ডা. মাহদি হালিমকে সহকর্মীদের হয়রানির অভিযোগে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা কয়েকটি অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়নি এবং তিনি বর্তমানে এনএইচএসে কর্মরত।

পোল্যান্ডে প্রশিক্ষিত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. টোমাসজ ফ্রিজলেভিচ বাধ্যতামূলক ইংরেজি ভাষা পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য চিকিৎসা করার অধিকার থেকে স্থগিত হয়েছেন। জিএমসির মতে, যুক্তরাজ্যে নিরাপদভাবে চিকিৎসা করার জন্য প্রয়োজনীয় যোগাযোগ দক্ষতা তাঁর ছিল না।

এদিকে, যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা প্রশিক্ষণের সুযোগ নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিদেশি চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি ব্রিটেনে প্রশিক্ষিত চিকিৎসা স্নাতকদের অনেকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণস্থানের সংকটে পড়ছেন। এ পরিস্থিতিতে জরুরি আইন করে এনএইচএস ট্রাস্টগুলোকে ব্রিটিশ মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা অধ্যাপক স্যার ক্রিস হুইটির সহ-রচনায় চিকিৎসা প্রশিক্ষণব্যবস্থা নিয়ে করা সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেশীয়ভাবে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, যুক্তরাজ্যে অভিজ্ঞতা অর্জনকারী আন্তর্জাতিক চিকিৎসক এবং নতুন আন্তর্জাতিক চিকিৎসকদের মধ্যে ভারসাম্য রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে এই অনুপাতের বড় পরিবর্তন প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় বিভিন্ন সংকট তৈরি করেছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের এনএইচএস থেকে চিকিৎসকদের বিদেশে চলে যাওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে। গত বছর ১২ হাজার ২৫৫ জন চিকিৎসক বিদেশে চিকিৎসা করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের আবেদন করেছেন। ২০২৪ সালের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ বেশি এবং ২০২০ ও ২০২১ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

ফলে একদিকে বিদেশে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের ওপর এনএইচএসের নির্ভরতা বাড়ছে, অন্যদিকে দেশীয় চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ সুযোগ, নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় অভিযোগের ভারসাম্য এবং চিকিৎসকদের বিদেশমুখী প্রবণতা—এই তিনটি বিষয় যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য খাতে নতুন করে নীতিগত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।

সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ

এম.কে

আরো পড়ুন

আদালতে সাক্ষ্য প্রদানে বিরল ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন প্রিন্স হ্যারি

যুক্তরাজ্যের সরকারি ওয়েবসাইটে ফিলিস্তিনের নাম ও মানচিত্র

ফ্রান্সে সনাক্তের পর নতুন ভ্যারিয়েন্ট এবার যুক্তরাজ্যে