জ্বালানি সংকট, সাইবার হামলা, আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাজ্যের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে দেশটির কোল্ড স্টোরেজ ও লজিস্টিকস খাত। খাতসংশ্লিষ্ট নেতারা সরকারের বিরুদ্ধে আত্মতুষ্টির অভিযোগ এনে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তাকে “তাৎক্ষণিক জাতীয় অগ্রাধিকার” হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাপমাত্রা-নিয়ন্ত্রিত খাদ্য ও ওষুধ সংরক্ষণ এবং পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন কোল্ড চেইন ফেডারেশন (সিসিএফ) বলেছে, বর্তমানে যুক্তরাজ্যের খাদ্য ব্যবস্থা এমন বহু ঝুঁকির ওপর নির্ভরশীল, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
সংগঠনটির প্রধান নির্বাহী ফিল প্লাক বলেন, “বড় ধরনের খাদ্য সংকটের সম্ভাবনা এখন আগের যেকোনো সময়ের মতোই বাস্তব। আমরা এমন বহু বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল, যেগুলো ক্রমেই খাদ্য সরবরাহের জন্য আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ব্রিটেনের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা কখনো বড় ধরনের জাতীয় সংকটের মুখোমুখি হয়নি। সিসিএফ-এর উপপ্রধান নির্বাহী টম সাউথল বলেন, সেই সময় দেশের প্রায় অর্ধেক কোল্ড স্টোরেজ সরকারি মালিকানায় ছিল। বর্তমানে বেসরকারি খাতনির্ভর এই ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও সক্ষমতা নিয়ে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
বর্তমানে যুক্তরাজ্য তার মোট খাদ্যের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করে। এসব খাদ্যের বেশিরভাগ মাত্র চারটি প্রধান বন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। ফলে সীমান্তে জট, আন্তর্জাতিক সংঘাত কিংবা বাণিজ্যিক বাধা তৈরি হলে খাদ্য সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।
সিসিএফ বলছে, জ্বালানি ঘাটতি, বন্যা, তাপপ্রবাহ বা অন্যান্য চরম আবহাওয়ার কারণে কোল্ড স্টোরেজ কেন্দ্রগুলো অচল হয়ে পড়লে সুপারমার্কেটের তাক খালি হয়ে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এসব ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালীতে চলমান অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক সার সরবরাহেও প্রভাব পড়েছে। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক খাদ্য উৎপাদন সারনির্ভর হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যুক্তরাজ্যের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় কোল্ড চেইনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাংস, মাছ, দুধ, শাকসবজি, ফল, রুটি ও প্রস্তুত খাবারের পাশাপাশি ওষুধ, ভ্যাকসিন, রক্ত এবং প্লাজমা সংরক্ষণ ও পরিবহনও এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। দেশজুড়ে প্রায় ৪৬০টি কোল্ড স্টোরেজ কেন্দ্র এবং এক লাখের কাছাকাছি ট্রাক প্রতিদিন এই সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৩ সালে ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকায় প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে টমেটো, শসা ও মরিচের সরবরাহ কমে গেলে যুক্তরাজ্যের বেশ কয়েকটি সুপারমার্কেট এসব পণ্যের বিক্রিতে সাময়িক সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে বাধ্য হয়েছিল।
ফিল প্লাক অভিযোগ করেন, কোল্ড চেইন খাত নিয়মিত সাইবার হামলার ঝুঁকিতে থাকলেও সরকার তাদের অবকাঠামোকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না। তিনি বলেন, “রুশ সাইবার অপরাধীরা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করে, কিন্তু যুক্তরাজ্য সরকার এখনো সেই স্বীকৃতি দেয়নি।”
তিনি সরকারের কাছে কোল্ড স্টোরেজ ও খাদ্য পরিবহন কেন্দ্রগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ক্রিটিক্যাল ন্যাশনাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোর মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানান। এতে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় এসব স্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।
প্লাক আরও সতর্ক করে বলেন, খাদ্য সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে এবং এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর।
এদিকে কোল্ড চেইন ফেডারেশন একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে, যেখানে কোল্ড স্টোরেজ ও পরিবহন কেন্দ্রের কর্মীদের স্থায়ীভাবে ‘অপরিহার্য কর্মী’ মর্যাদা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা তদারকির দায়িত্ব সরাসরি মন্ত্রিপরিষদ কার্যালয়ের অধীনে নেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, খাদ্য খাত ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যের ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো খাতের একটি হিসেবে বিবেচিত। সরকার দেশীয় খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, জলবায়ু সহনশীল ফসল উদ্ভাবন এবং কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়নে বিলিয়ন বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবুও খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা, সাইবার হুমকি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যকে বড় ধরনের খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

