21 C
London
September 7, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে ত্বকের ক্যানসার ভয়াবহ হারে বৃদ্ধিঃ মেলানোমা আক্রান্ত ২০ হাজার ছাড়িয়েছে

যুক্তরাজ্যে ত্বকের ক্যানসারের অন্যতম গুরুতর ধরন মেলানোমায় আক্রান্তের সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। নতুন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশটিতে প্রথমবারের মতো বছরে মেলানোমা আক্রান্তের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যে ২০ হাজার ৯৮০ জনের মেলানোমা শনাক্ত হয়েছিল।

এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত রোদ, অতিবেগুনি রশ্মি বা ইউভি রেডিয়েশন এবং কৃত্রিমভাবে ত্বক ট্যান করার প্রবণতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে দ্য গার্ডিয়ান বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের আলো থেকে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকিও আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

২০২৬ সালের ইউরোপের অস্বাভাবিক উষ্ণ ও শুষ্ক গ্রীষ্মে খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষ এবং অবসর সময়ে রোদে থাকা ব্যক্তিরা ইউভি রশ্মির ঝুঁকির আরও বেশি মুখোমুখি হয়েছেন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত গরম ও পানিশূন্যতার ঝুঁকিও বেড়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের মতে, জলবায়ুর নতুন ঝুঁকির সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকির এই সম্পর্ককে জনস্বাস্থ্য নীতিতেও গুরুত্ব দিতে হবে।

ক্যানসার রিসার্চ ইউকে-এর বিশ্লেষণ বলছে, যুক্তরাজ্যে মেলানোমা আক্রান্তের সংখ্যা ২০৪০ সালের মধ্যে বছরে ২৬ হাজার ৫০০-তে পৌঁছাতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২৩ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ২৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও মানুষের গড় বয়স বাড়ার বিষয়টিও এই বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে।

মেলানোমা যুক্তরাজ্যের পঞ্চম সর্বাধিক সাধারণ ক্যানসার। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ক্যানসার রিসার্চ ইউকে-এর হিসাবে দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ মেলানোমা আক্রান্তের সঙ্গে সূর্য ও সানবেড থেকে অতিরিক্ত ইউভি রশ্মির সংস্পর্শের সম্পর্ক রয়েছে। পাঁচবার বা তার বেশি রোদে ত্বক পুড়ে গেলে মেলানোমার ঝুঁকি দ্বিগুণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ত্বকের ক্যানসারের বড় একটি অংশ প্রতিরোধযোগ্য। সূর্য তীব্র হলে ছায়ায় থাকা, শরীর ঢেকে রাখা, টুপি ও সানগ্লাস ব্যবহার এবং উচ্চমাত্রার সানস্ক্রিন ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ক্যানসার রিসার্চ ইউকে অন্তত এসপিএফ ৩০ সানস্ক্রিন ব্যবহারের এবং নিয়মিত তা পুনরায় লাগানোর পরামর্শ দিয়েছে।

শুধু তীব্র গরমের দিনেই যে ত্বক পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, তা নয়। তুলনামূলক ঠান্ডা বা মেঘলা দিনেও ইউভি রশ্মির কারণে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে। তাই আবহাওয়া ঠান্ডা মনে হলেও দীর্ঘ সময় সরাসরি রোদে থাকার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কৃত্রিমভাবে ত্বক ট্যান করার জন্য সানবেড ব্যবহারের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মে মাসে একদল ব্রিটিশ এমপি সানবেডের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেন। এর আগে বিশেষজ্ঞরা বাণিজ্যিকভাবে সানবেডের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিলে এ ধরনের কঠোর ব্যবস্থা রয়েছে বলে দ্য গার্ডিয়ান উল্লেখ করেছে।

যুক্তরাজ্যের জাতীয় ক্যানসার পরিকল্পনাতেও সানবেড নিয়ে আরও প্রমাণ সংগ্রহের কথা রয়েছে। একই সময়ে তরুণদের মধ্যে ট্যানিংয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর প্রচার এই প্রবণতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে বলে দ্য গার্ডিয়ানের সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘদিনের জনস্বাস্থ্য প্রচারণাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৮১ সালে দেশটিতে ‘স্লিপ, স্লপ, স্ল্যাপ’ প্রচারণা শুরু হয়েছিল। এর মূল বার্তা ছিল জামা দিয়ে শরীর ঢেকে রাখা, সানস্ক্রিন ব্যবহার এবং মাথায় টুপি পরা। দেশটির স্কুলগুলোতে ‘নো হ্যাট, নো প্লে’ নীতিও চালু রয়েছে, অর্থাৎ টুপি ছাড়া রোদে খোলা জায়গায় খেলাধুলা করা যাবে না।

দ্য গার্ডিয়ানের মতে, যুক্তরাজ্যে সূর্যের আলো ও অতিরিক্ত তাপমাত্রা দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে কম থাকায় মানুষের মধ্যে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। তবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকায় এই পুরোনো ধারণা বদলানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

এদিকে ক্যানসারের চিকিৎসায় ইমিউনোথেরাপিসহ আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে বড় অগ্রগতি হলেও শুধু উন্নত চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে রোগ প্রতিরোধ ও জনস্বাস্থ্য সচেতনতার ওপরও জোর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে মেলানোমার মতো ক্যানসারের ক্ষেত্রে মানুষের আচরণ পরিবর্তন করে ঝুঁকি কমানোর সুযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ত্বকে নতুন বা পরিবর্তিত তিল, দীর্ঘদিন না শুকানো ক্ষত কিংবা অস্বাভাবিক কোনো দাগ দেখা গেলে দ্রুত জিপির সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। মেলানোমা দ্রুত শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার ফল অনেক ভালো হতে পারে।

রেকর্ড তাপমাত্রার এই গ্রীষ্মের পর দ্য গার্ডিয়ান মনে করছে, ২০২৭ সালের গ্রীষ্ম আসার আগেই সূর্যের আলো ও কৃত্রিম ইউভি রশ্মির ঝুঁকি নিয়ে যুক্তরাজ্যে আরও জোরালো জনসচেতনতামূলক প্রচারণা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে সূর্যজনিত ত্বকের ক্যানসার প্রতিরোধও দেশটির জনস্বাস্থ্য নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান ও ক্যানসার রিসার্চ ইউকে

এম.কে

আরো পড়ুন

ব্রিটিশ রাজনীতিতে আলোড়নঃ সাবেক এমপি জর্জ গ্যালোওয়ে দম্পতি আটক হয়ে আবারও আলোচনায়

নিউজ ডেস্ক

হরমুজ প্রণালী খুলতে কূটনৈতিক তৎপরতা, আমিরাতে পৌঁছালেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

যুক্তরাজ্য লেবার সরকার জোর করে ফেরত পাঠাচ্ছে অবৈধ অভিবাসীদের