যুক্তরাজ্যের সামাজিক সেবা খাতে অভিবাসী কেয়ারকর্মীদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন, বর্ণবাদ, হয়রানি ও আর্থিক শোষণের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের পর দেশটির ভিসা স্পনসরশিপ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের দাবি জানিয়েছে রয়্যাল কলেজ অব নার্সিং (আরসিএন)। সংগঠনটির দাবি, বর্তমান ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তার হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা থাকায় অভিবাসী কর্মীরা চাকরি হারানো ও ভিসা বাতিলের আশঙ্কায় নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারছেন না।
ডেইলি মিররের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরসিএনের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সহায়তা চাওয়া অভিবাসী স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবাকর্মীদের ৩৮৩টি ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭টি ঘটনায় চাকরি ছাড়তে চাওয়া কর্মীদের কাছ থেকে অর্থ ফেরত দেওয়ার দাবি বা ‘রিপেমেন্ট ক্লজ’ ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব দাবির অর্ধেকেরও বেশি ছিল ৩ হাজার পাউন্ডের বেশি। একটি ঘটনায় একজন কর্মীকে চাকরির চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে চাকরি ছাড়তে চাইলে ২৫ হাজার পাউন্ড পরিশোধ করতে বলা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রায় প্রতি পাঁচটি ঘটনার একটি ছিল বেতনসংক্রান্ত অভিযোগ। অনেক কর্মীর দাবি, তাদের চুক্তিতে উল্লেখ করা বেতনের তুলনায় কম অর্থ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৩৫টি ঘটনায় দেখা গেছে, কর্মীরা চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তাদের চুক্তির শর্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। এসব পরিবর্তনের মধ্যে বেতন কমিয়ে দেওয়া এবং কর্মীদের দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও নিপীড়ন। আরসিএনের বিশ্লেষণে ৬৮টি গুরুতর বুলিং ও হয়রানির ঘটনা উঠে এসেছে। এর কয়েকটিতে বর্ণবাদী বৈষম্যের অভিযোগও রয়েছে।
আরসিএনের মহাসচিব অধ্যাপক নিকোলা রেঞ্জার বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, সামাজিক সেবা খাতে অভিবাসী কর্মীদের ওপর যে ধরনের শোষণ চলছে, তা বন্ধ না করে একটি কার্যকর জাতীয় কেয়ার সার্ভিস গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, বর্তমান ভিসা স্পনসরশিপ ব্যবস্থা নিয়োগকর্তা ও কর্মীর মধ্যে একটি বিপজ্জনক ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে। কোনো কোনো অসাধু নিয়োগকর্তা স্পনসরশিপ প্রত্যাহারের ভয় দেখিয়ে কর্মীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, চুক্তির শর্ত পরিবর্তন, বেতন কমানো কিংবা ভয়ভীতি ও হয়রানি করার সুযোগ পাচ্ছেন।
আরসিএনের দাবি, সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং প্রকাশ্যে আসা ঘটনাগুলো প্রকৃত সমস্যার একটি অংশমাত্র। অনেক অভিবাসী কর্মী চাকরি ও ভিসা হারানোর আশঙ্কায় নির্যাতনের কথা প্রকাশ্যে বলতে ভয় পান।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা ভিসায় থাকা কর্মীদের নির্দিষ্ট একজন নিয়োগকর্তার স্পনসরশিপের ওপর নির্ভর করতে হয়। চাকরি পরিবর্তন করতে হলে নতুন নিয়োগকর্তার স্পনসরশিপ এবং ভিসার প্রয়োজন হয়। আরসিএনের মতে, এই নির্ভরশীলতাই অসাধু নিয়োগকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা তুলে দিয়েছে।
সমস্যা মোকাবিলায় সংগঠনটি ভিসা ব্যবস্থায় একটি নতুন কেন্দ্রীয় বা ‘আমব্রেলা’ সংস্থা তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে। এর মাধ্যমে কর্মীদের নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে চাকরি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাদের আরও সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া নতুন ‘ফেয়ার ওয়ার্ক এজেন্সি’কে সামাজিক সেবা খাতে কর্মীদের সঙ্গে নিয়োগকর্তাদের আচরণ কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ এবং অনৈতিক ব্যবসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আরসিএন।
চাকরি হারানো বা পরিবর্তনের পর নতুন নিয়োগকর্তা খুঁজে নেওয়ার সময়সীমা বাড়ানোরও দাবি জানানো হয়েছে। বর্তমানে যে ৬০ দিন সময় দেওয়া হয়, তা বাড়িয়ে ১৮০ দিন করার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। আরসিএনের মতে, এতে কর্মীরা হঠাৎ চাকরি হারিয়ে ভিসা সংকটে পড়া এবং যুক্তরাজ্য ছাড়তে বাধ্য হওয়ার ঝুঁকি থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাবেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যের সামাজিক সেবা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। তিনি দ্রুত একটি নতুন জাতীয় কেয়ার সার্ভিস গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।
সম্প্রতি এক বক্তব্যে বার্নহ্যাম বিদেশি কেয়ারকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তার নিজের বাবা আলঝেইমার্স রোগে আক্রান্ত এবং বিভিন্ন দেশের মানুষ তার বাবার যত্ন নিয়েছেন। তিনি বিদেশি কেয়ারকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, যুক্তরাজ্যে মানুষের যত্ন নেওয়ার জন্য তাদের অবদানের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ।
অন্যদিকে অভিবাসন নীতিতে আরও বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত সংস্কারের একটি অংশে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা আইএলআর পাওয়ার জন্য অপেক্ষার সময় বর্তমান পাঁচ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়টি রয়েছে। তবে কেয়ারকর্মীরা এই দীর্ঘ অপেক্ষার আওতায় পড়বেন কি না, তা নিয়ে জল্পনা রয়েছে।
সরকার অবশ্য জানিয়েছে, শ্রমিক শোষণ এবং অসাধু নিয়োগকর্তাদের মাধ্যমে অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে। সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, যেসব কেয়ার প্রদানকারী তাদের স্পনসর লাইসেন্স ব্যবহার করে কর্মীদের শোষণ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সরকার আরও জানিয়েছে, কেয়ার খাতে অনিয়ম ও শোষণের মাত্রা অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছানোর পর বিদেশ থেকে নতুন কেয়ারকর্মী নিয়োগ বন্ধ করা হয়েছে।
তবে নার্সিং খাতের নেতারা বলছেন, শুধু বিদেশি কর্মী নিয়োগ বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। যারা ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে রয়েছেন এবং দেশের সামাজিক সেবা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করছেন, তাদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, ন্যায্য বেতন এবং অভিযোগ করার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
যুক্তরাজ্যের প্রাপ্তবয়স্ক কেয়ার খাতের প্রায় ৩০ শতাংশ কর্মী ব্রিটিশ নাগরিক নন। ফলে অভিবাসী কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল এই খাতে শোষণের অভিযোগের সমাধান এখন শুধু শ্রম অধিকার নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ সামাজিক সেবা ব্যবস্থার স্থায়িত্বের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।
আরসিএনের দাবি, একটি কার্যকর জাতীয় কেয়ার সার্ভিস গড়ে তুলতে হলে অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষা, নিয়োগকর্তার জবাবদিহি এবং ভিসা ব্যবস্থার ক্ষমতার ভারসাম্য—এই তিন ক্ষেত্রেই মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। অন্যথায় শোষণের অভিযোগ অব্যাহত থাকলে কেয়ার খাতে কর্মী সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্রঃ মিরর
এম.কে

