TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের নিয়ম কঠোর করায় বিদ্রোহের মুখে শাবানা মাহমুদ

যুক্তরাজ্যে অভিবাসীদের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার নিয়ম কঠোর করার পরিকল্পনা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ লেবার দলের ভেতরেই ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহের মুখে পড়েছেন। সংসদের গ্রীষ্মকালীন বিরতি শেষে অধিবেশন শুরুর পর আরও ১০ জন লেবার এমপি প্রকাশ্যে তার পরিকল্পনার বিরোধিতা করতে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

মাহমুদের প্রস্তাবের মূল বিষয় হলো, অধিকাংশ অভিবাসীর স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার সাধারণ সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে থাকা অভিবাসীদেরও নতুন নিয়মের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এই পূর্বপ্রযোজ্যতার বিষয়টিই লেবার এমপিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে।

লেবার এমপি নিল ডানকান-জর্ডান নতুন নিয়ম শিথিল করার দাবিতে সংসদীয় একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। ইতোমধ্যে এতে ৬৪ জন এমপি সমর্থন জানিয়েছেন, যার মধ্যে ৩৭ জন লেবার এমপি। আগামী ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে সমর্থকদের হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে প্রকাশ্যে প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এমপির সংখ্যা দলের অভ্যন্তরে উদ্বিগ্ন এমপিদের প্রকৃত সংখ্যা নয় বলে মনে করা হচ্ছে। প্রায় ১০০ জন লেবার এমপি ব্যক্তিগতভাবে মন্ত্রীদের কাছে পরিকল্পনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।

বিরোধিতা সামাল দিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ ও প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম কিছুটা ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। পাঁচ বছরের পরিবর্তে ১০ বছরের নতুন নিয়ম নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার পর সরকার এই অবস্থান পুনর্বিবেচনার চাপের মুখে পড়েছে।

নতুন নিয়মের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আপত্তিগুলোর একটি হলো, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে থাকা কর্মীদের ওপর এটি প্রয়োগ করা হতে পারে। লেবার এমপিদের একাংশ মনে করছেন, যারা পুরোনো নিয়মের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যে এসে পাঁচ বছর কাজ ও বসবাসের পর স্থায়ী হওয়ার প্রত্যাশায় জীবন গড়ে তুলেছেন, তাদের ক্ষেত্রে হঠাৎ নিয়ম পরিবর্তন করা অন্যায্য হবে।

একটি সাম্প্রতিক জনমত জরিপেও এই অবস্থানের প্রতি উল্লেখযোগ্য সমর্থন দেখা গেছে। জরিপে ৪৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, যারা ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে রয়েছেন, তাদের নতুন নিয়ম থেকে অব্যাহতি দেওয়া উচিত। বিপরীতে ৩৩ শতাংশ মনে করেন, নতুন নিয়ম তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

একই জরিপে কম দক্ষ স্বাস্থ্য ও সামাজিক কেয়ার কর্মীদের নতুন নিয়ম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পক্ষেও উল্লেখযোগ্য সমর্থন পাওয়া গেছে।

নিল ডানকান-জর্ডান ও তার সমর্থকেরা দাবি করছেন, সামাজিক কেয়ারসহ সব দক্ষ কর্মী ভিসাধারীর জন্য স্থায়ী বসবাসের ক্ষেত্রে আগের পাঁচ বছরের পথ বহাল রাখা উচিত। তাদের যুক্তি, এসব কর্মী কর দিচ্ছেন, স্থানীয় সমাজে অবদান রাখছেন এবং সরকারি অর্থ সহায়তা পাওয়ার অধিকার তাদের নেই।

সংসদীয় প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এসব কর্মী পরিষ্কার একটি প্রত্যাশা নিয়ে যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন—পাঁচ বছর কাজ ও বসবাসের পর স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পাবেন। সেই প্রত্যাশার ভিত্তিতে অনেকে যুক্তরাজ্যে পরিবার ও পেশাজীবন গড়ে তুলেছেন।

ডানকান-জর্ডান সতর্ক করে বলেছেন, মাঝপথে অভিবাসন আইনের নিয়ম পরিবর্তন করলে অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে দক্ষ কর্মীর সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বর্তমান পরিকল্পনা বহাল থাকলে অতীতের উইন্ডরাশ কেলেঙ্কারির মতো বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এতে সরকারি সেবা, এসব সেবার ওপর নির্ভরশীল মানুষ এবং দীর্ঘদিন ধরে সেবা দিয়ে আসা কর্মী—সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে বিদেশি কেয়ার কর্মী নিয়োগ কমে যাওয়ার প্রভাব নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউনিসন শ্রমিক সংগঠনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিদেশি কর্মীর সংখ্যা কমে যাওয়ার পর সামাজিক কেয়ার খাতে তৈরি হওয়া শূন্য পদগুলো ব্রিটিশ কর্মীদের দিয়ে পূরণ করা যাচ্ছে না।

ইউনিসনের সাধারণ সম্পাদক আন্দ্রেয়া ইগান বলেছেন, মাহমুদ যদি বিদ্রোহী এমপিদের কিছুটা ছাড় না দেন, তাহলে সেপ্টেম্বরের শেষদিকে অনুষ্ঠিতব্য লেবার পার্টির সম্মেলনে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরা হবে।

লেবার এমপিদের ক্রমবর্ধমান বিরোধিতা প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের জন্যও বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। গ্রীষ্মকালীন বিরতির পর সংসদীয় কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হওয়ায় তার সরকারের প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরীক্ষাগুলোর একটি হতে পারে এই অভিবাসন সংস্কার।

হোম অফিস জানিয়েছে, গত বছরের নভেম্বরে সরকার ঘোষণা করেছিল যে অধিকাংশ অভিবাসীর স্থায়ী বসবাসের অনুমতির সাধারণ যোগ্যতার সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হবে। তবে যুক্তরাজ্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের জন্য অপেক্ষাকৃত কম সময়ের পথ রাখা হবে।

হোম অফিস আরও জানিয়েছে, প্রস্তাবিত সংস্কারের বিভিন্ন দিক নিয়ে সরকারের পরামর্শ গ্রহণ প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। পরামর্শের ফলাফল পর্যালোচনা করে যথাসময়ে সরকারের সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—নতুন নিয়ম সবার ক্ষেত্রে একইভাবে কার্যকর করা হবে, নাকি ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে থাকা কর্মী ও দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ খাতে কাজ করা ব্যক্তিদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হবে। লেবার দলের অভ্যন্তরীণ চাপ যত বাড়ছে, এই সিদ্ধান্ত ততই বার্নহ্যাম সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সূত্রঃ দ্য আই পেপার

এম.কে

আরো পড়ুন

যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো মহিলা ডাক্তারদের সংখ্যা পুরুষ সহকর্মীদের ছাড়িয়ে গেছে

‘অবৈধ অভিবাসীদের নাগরিকত্ব দিচ্ছে লেবার’—ফারাজের তোপ, ক্ষমতায় এলে সবাইকে ফেরত পাঠানোর ঘোষণা

বিপজ্জনক অপরাধীদের আগাম মুক্তিতে কড়া সতর্কতা ব্রিটেনের শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার