29.1 C
London
August 3, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে হরাইজন কেলেঙ্কারিতে জীবন ধ্বংসঃ ১৫ বছর পর আবার পোস্ট অফিসে ফিরলেন নির্দোষ কর্মী

হরাইজন আইটি কেলেঙ্কারিতে ভুলভাবে ৩৮ হাজার পাউন্ড আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে ব্যবসা, বাড়ি, সুনাম এবং স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছিলেন বার্মিংহামের হ্যান্ডসওয়ার্থ এলাকার সাব-পোস্টমাস্টার রোপরিত (রোপ্রি) গিল। দীর্ঘ ১৫ বছর পর তিনি আবার সেই ওয়াটভিল রোড পোস্ট অফিসের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, যেখান থেকেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্নের সূচনা হয়েছিল।

গত বছরের আগস্টে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে একই শাখার পোস্টমিস্ট্রেস হিসেবে দায়িত্ব নেন। রোপরিত বলেন, ব্যবসা ফিরিয়ে আনার চেয়ে নিজের নির্দোষ প্রমাণ করাই ছিল তার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।

তার ভাষায়, “আমি চেয়েছিলাম মানুষ জানুক আমি এটা করিনি। আমি আমার সেই জায়গায় ফিরতে চেয়েছিলাম, যেখানে আমি এই কমিউনিটির অংশ ছিলাম।”

রোপরিতের পরিবারের এই পোস্ট অফিস ও দোকানের ব্যবসা প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো। ছোটবেলা থেকেই তিনি পরিবারের সঙ্গে দোকানে কাজ করতেন। পরে কেয়ার ম্যানেজার হিসেবে কাজ করলেও ২০০৫ সালে বাবার অবসরের পর পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব নেন।

দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই হরাইজন কম্পিউটার সিস্টেমে রহস্যজনকভাবে হিসাবের ঘাটতি দেখা দিতে শুরু করে। প্রতিদিন শত শত পাউন্ডের ঘাটতি দেখা গেলেও পোস্ট অফিসের হেল্পলাইন কোনো সমাধান দিতে পারেনি। বরং ঘাটতি পূরণের জন্য তাকে নিজের অর্থ ব্যবসায় ঢালতে হয়।

২০১০ সালে অডিটের পর তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং ৩৮ হাজার পাউন্ড ঘাটতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়।

এরপর একের পর এক বিপর্যয় নেমে আসে তার পরিবারের ওপর। পোস্ট অফিসের দাবি মেটাতে বাবা-মাকে বিদেশের সম্পত্তি বিক্রি করতে হয়। পরিবার বাড়ি ও গাড়ি হারায়। দেউলিয়া হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এমনকি মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুদানের অর্থ দিয়েও সংসারের খরচ চালাতে হয়েছিল।

এই ঘটনার মানসিক আঘাতও ছিল ভয়াবহ। দোকান থেকেই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন রোপরিত। জনসমক্ষে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় থানায়। অপমান ও হতাশায় একপর্যায়ে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন তিনি।

তিনি বেঁচে গেলেও পরিবার আর আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি। তার স্বামী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে মদ্যপানে আসক্ত হন এবং পরে মারা যান। এমনকি পরিবারের কিছু সদস্যও দীর্ঘদিন বিশ্বাস করেছিলেন, রোপরিত সত্যিই অর্থ আত্মসাৎ করেছিলেন।

রোপরিত জানান, শুধু তার বাবা-মাই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার নির্দোষতার ওপর আস্থা রেখেছিলেন।

বহু বছর তিনি মনে করেছিলেন এই দুর্ভাগ্য শুধু তার সঙ্গেই ঘটেছে। পরে সাংবাদিক নিক ওয়ালিসের একটি পডকাস্টে হরাইজন কেলেঙ্কারি সম্পর্কে জানতে পেরে বুঝতে পারেন, যুক্তরাজ্যের শত শত সাব-পোস্টমাস্টার একই ধরনের অন্যায়ের শিকার হয়েছেন।

এরপর তিনি আইনি লড়াই শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দেওয়া দোষী সাব্যস্তের রায় বাতিল হয় এবং তিনি নির্দোষ হিসেবে স্বীকৃতি পান।

এরপর আবার পোস্ট অফিসের দায়িত্ব ফিরে পেতে নতুন করে আবেদন, সাক্ষাৎকার এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা জমা দিতে হয়। সব প্রক্রিয়া শেষে তিনি আবার নিজের পুরোনো শাখার দায়িত্ব ফিরে পান।

দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়েই শাখাটির অবস্থারও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। গুগলে পোস্ট অফিসটির রেটিং ১.১ স্টার থেকে বেড়ে ৪.৩ স্টারে উন্নীত হয়েছে। পুরোনো গ্রাহকেরা ফিরে এসেছেন, বিক্রি বেড়েছে এবং ব্যবসা আবার লাভজনক হয়ে উঠেছে।

রোপরিত বলেন, এখন তিনি আর বিচারিত হওয়ার ভয় নিয়ে নয়, বরং গর্বের সঙ্গে পোস্ট অফিসের কাউন্টারের পেছনে দাঁড়াতে পারেন।

তিনি এখনও বিশ্বাস করেন, স্থানীয় পোস্ট অফিস একটি কমিউনিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকের শাখা কমে যাওয়া এবং পোস্ট অফিস বন্ধ হওয়ার প্রবণতায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে প্রবীণরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে মনে করেন তিনি।

তার ভাষায়, “পোস্ট অফিস শুধু পার্সেল পাঠানোর জায়গা নয়। মানুষ এখানে সাহায্য চাইতে আসে, পরামর্শ নিতে আসে।”

তবে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও এখনও তিনি সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পাননি। রোপরিতের দাবি, শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, এই কেলেঙ্কারির জন্য দায়ীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

তিনি বলেন, “আমি চাই কেউ দায় স্বীকার করুক। সবাই দায় এড়িয়ে যাচ্ছে।”

সবচেয়ে বড় আক্ষেপের কথা বলতে গিয়ে রোপরিত জানান, তার বাবা মৃত্যুর আগে জানতে পারেননি যে আদালত তাকে নির্দোষ ঘোষণা করেছে।

যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিচারিক কেলেঙ্কারিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হরাইজন কেলেঙ্কারিতে ১৯৯৯ সালে চালু হওয়া ফুজিতসুর হরাইজন সফটওয়্যারের ত্রুটির কারণে হাজারো পোস্ট অফিস শাখায় ভুয়া হিসাবের ঘাটতি তৈরি হয়। সেই ত্রুটির ভিত্তিতে ৯০০-এর বেশি সাব-পোস্টমাস্টারের বিরুদ্ধে চুরি, জালিয়াতি ও মিথ্যা হিসাবের অভিযোগে মামলা করা হয়। অনেকেই ব্যবসা, বাড়ি, সঞ্চয় ও সম্মান হারান।

পরবর্তীতে সফটওয়্যারের ত্রুটি প্রমাণিত হওয়ার পর বহু দণ্ডাদেশ বাতিল করা হয়েছে এবং ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি চালু হয়েছে। তবে এখনও অনেক ভুক্তভোগী পূর্ণ ক্ষতিপূরণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

সূত্রঃ মিরর

এম.কে

আরো পড়ুন

ড্রাইভওয়ে থাকলে সুবিধা, না থাকলে বাড়তি খরচ—ইভি চার্জিং ভ্যাট নিয়ে বিতর্কে যুক্তরাজ্য

অভিবাসী ও শরণার্থীরা যুক্তরাজ্যে স্বাগত, ট্রাম্প-প্রেমী নীতির বিপরীতে দাঁড়াবে গ্রিনরাঃ পোলানস্কি

এশিয়ান ও কৃষাঙ্গ যুবাদের যুক্তরাজ্য ছাড়ার প্রবনতা বাড়ছেঃ গবেষণা