12 C
London
October 17, 2026
TV3 BANGLA
যুক্তরাজ্য (UK)

যুক্তরাজ্যে ৯৯ বছর বয়সী বৃদ্ধার ৭ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড আত্মসাৎঃ চাকরি হারালেন নার্স

যুক্তরাজ্যে ৯৯ বছর বয়সী এক অসহায় বৃদ্ধার প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড আত্মসাৎ করে নিজের প্রসাধনী অস্ত্রোপচার, বাড়ির সংস্কার, গাড়ি ও ক্যাম্পারভ্যান কেনাসহ ব্যক্তিগত কাজে খরচ করার অভিযোগে এক নার্সের পেশাগত নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। রেবেকা লুইস বারউড নামের ওই নার্স উত্তর ওয়েলসের ফ্লিন্টশায়ারের মোল্ড শহরের ব্রিন ইর হাউল কেয়ার হোমের উপব্যবস্থাপক ছিলেন।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছয় বছর ধরে বৃদ্ধার আস্থা ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। বারউড বৃদ্ধার পরিচর্যার দায়িত্বে থাকার পাশাপাশি তার আর্থিক বিষয় পরিচালনার আইনি ক্ষমতাও নিজের হাতে নেন। অথচ ওই বৃদ্ধা তার বন্ধুত্ব ও সামাজিক যোগাযোগের জন্য বারউডের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।

নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের (এনএমসি) শুনানিতে বলা হয়, ২০১৮ সালে বৃদ্ধা ওই কেয়ার হোমে ওঠার আগেই বারউডের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল। বৃদ্ধার কোনো পরিবারের সদস্য ছিলেন না। পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার পর তিনি আরও অসহায় হয়ে পড়েন এবং বন্ধুত্ব ও সঙ্গ পাওয়ার জন্য বারউডের ওপর নির্ভর করতে থাকেন।

শুনানিতে উঠে আসে, বারউড বৃদ্ধার ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ তুলে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করেন। পাঁচ বছরে বৃদ্ধার ব্যাংক হিসাব থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার পাউন্ডের বেশি অর্থ বেরিয়ে যায়। এর মধ্যে এটিএম থেকে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ তোলার মাধ্যমে খরচ করা হয় ১ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড।

এ ছাড়া বৃদ্ধাকে আইনজীবীর কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে প্রায় ৪ লাখ পাউন্ড মূল্যের বাড়ির মালিকানা নিজের নামে হস্তান্তর করান বারউড। বাড়ির সংস্কার, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ বিভিন্ন পরিষেবার বিল এবং কাউন্সিল ট্যাক্স পরিশোধেও বৃদ্ধার অর্থ ব্যবহার করা হয়েছিল বলে শুনানিতে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। ওই অর্থের কিছু অংশ নিজের প্রসাধনী অস্ত্রোপচারে ব্যয় করার অভিযোগও ওঠে।

বৃদ্ধার কাছ থেকে গাড়ি কেনার জন্য ২০ হাজার পাউন্ড এবং একটি ক্যাম্পারভ্যান কেনার জন্য ৯ হাজার পাউন্ড নেওয়া হয়েছিল। বারউড দাবি করেছিলেন, দুজন একসঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যাবেন বলেই এসব যানবাহন কেনা হয়েছিল।

নিজের বাড়ির সংস্কারকাজের ব্যাখ্যায় বারউড বলেছিলেন, কোভিডের আরেকটি প্রাদুর্ভাব হলে বৃদ্ধাকে নিজের সঙ্গে রাখার ব্যবস্থা করতেই তিনি বাড়িতে কাজ করিয়েছিলেন। তবে শুনানিতে উঠে আসে, যুক্তরাজ্যে কোভিডের লকডাউন শুরুর আগেই ওই সংস্কারকাজের অর্থ পরিশোধ করা হয়েছিল।

বারউডের দাবি ছিল, বৃদ্ধা নিজেই তাকে ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ তুলে বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে অনুদান দিতে বলতেন। প্রতিবার ২৫০ থেকে ৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হতো বলে তিনি জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অন্ধ ব্যক্তিদের সহায়তা করে কিংবা হৃদরোগ নিয়ে কাজ করে—এমন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে এসব অর্থ দেওয়া হয়েছিল।

বারউডের আইনজীবী ভিক্টোরিয়া রিস শুনানিতে বলেন, বৃদ্ধা মৃত্যুর আগে নিজের সব অর্থ খরচ করে ফেলতে চেয়েছিলেন, কারণ তিনি চাননি তার অর্থ সরকারের হাতে যাক। তবে বারউড কত টাকা তুলেছেন কিংবা কত টাকা অনুদান দিয়েছেন, তার কোনো হিসাব রাখেননি।

বৃদ্ধার ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অর্থের অস্বাভাবিক ব্যবহার নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বিষয়টি নর্থ ওয়েলস পুলিশকে জানায়। পরে ব্যাংক হিসাবটি স্থগিত করা হলে বারউড সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং বৃদ্ধাকে ব্যাংকের শাখায় নিয়ে যান।

ব্যাংকের কর্মীদের অভিযোগ, বারউড প্রায় ব্ল্যাকমেইল করার মতো আচরণ করে বৃদ্ধাকে হিসাবের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বলতে বাধ্য করেছিলেন। শুনানিতে আরও বলা হয়, বারউড বৃদ্ধাকে জানিয়েছিলেন, তার অর্থ ব্যবহারের সুযোগ না থাকলে তাকে আর বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।

পরে বৃদ্ধা সুরক্ষাবিষয়ক কর্মীদের কাছে জানান, তার ব্যাংক হিসাব থেকে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ হয়েছে জেনে তিনি হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন।

কেয়ার হোমের আরেকজন নার্স বারউডকে বৃদ্ধাকে বলতে শুনেছিলেন, ‘আমি তোমাকে টাকা ফেরত দেব’ এবং ‘এখানে স্বাক্ষর করো’। ওই নার্স বিষয়টিকে আর্থিক নির্যাতনের সম্ভাব্য প্রমাণ হিসেবে কর্তৃপক্ষকে জানান। এরপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বারউড কেবল তত্ত্বাবধানে বৃদ্ধার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন।

বারউড দাবি করেন, তিনি কোনো আর্থিক নথিতে স্বাক্ষর করাতে চাননি; বরং বৃদ্ধাকে একটি শোকবার্তায় স্বাক্ষর করতে সাহায্য করছিলেন। বৃদ্ধার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল থাকায় তিনি কার্ডটি ধরে কোথায় স্বাক্ষর করতে হবে, তা দেখিয়ে দিয়েছিলেন বলে তার দাবি।

পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও বৃদ্ধা বারউডের বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নিতে চাননি। তিনি বারউডকে বন্ধু মনে করতেন এবং বিশ্বাস করতেন, তিনি নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন।

এনএমসির শুনানি প্যানেল সিদ্ধান্তে জানায়, বারউড ও বৃদ্ধার সম্পর্কের মধ্যে ক্ষমতার বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা ছিল। বারউড দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পিতভাবে বৃদ্ধাকে প্রভাবিত করে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে তার অর্থ ও সম্পদ ব্যবহার করেছেন।

প্যানেল আরও জানায়, যে কেয়ার হোমে তিনি কাজ করতেন, সেখানকার একজন বাসিন্দার আর্থিক বিষয় পরিচালনার আইনি ক্ষমতা নিজের হাতে নেওয়ার কথা নিয়োগকর্তাকে না জানিয়ে বারউড অসততার পরিচয় দিয়েছেন। তার আচরণ নার্সিং পেশার মৌলিক মানদণ্ডের গুরুতর লঙ্ঘন এবং বৃদ্ধার আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ হয়েছে।

সিদ্ধান্তে প্যানেল তার আচরণকে নিন্দনীয় উল্লেখ করে জানায়, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে নার্সিং পেশার প্রতি জনসাধারণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতো। তার আচরণকে পূর্বপরিকল্পিত, নৈতিকভাবে গুরুতর আপত্তিকর এবং পেশাগতভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়।

বারউড নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বৃদ্ধাকে নিজের নানির মতো মনে করতেন। তবে প্যানেলের মতে, এই সম্পর্কের অজুহাতে তিনি পেশাগত সীমারেখা অতিক্রম করেছেন এবং বিশ্বাসের অপব্যবহার করেছেন।

ওই বৃদ্ধা পরবর্তীতে মারা গেছেন। তার অর্থ থেকে শেষ পর্যন্ত মাত্র ২৩ মাসের পরিচর্যার খরচ বহন করার মতো অর্থ অবশিষ্ট ছিল। এরপর প্রয়োজন হলে স্থানীয় কাউন্সিলকে তার পরিচর্যার দায়িত্ব নিতে হতো।

কেয়ার হোমটির পরিচালন বিভাগের পরিচালক জেমস ব্র্যাডফোর্ড বলেন, এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা গভীরভাবে মর্মাহত এবং ক্ষতিগ্রস্ত সবার কাছে তারা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছেন। বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, এনএমসির সিদ্ধান্তকে তারা পূর্ণ সমর্থন করেন। ঘটনার পর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং বাসিন্দাদের সুরক্ষায় নীতিমালা ও পদ্ধতিগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে।

সূত্রঃ বিবিসি

এমকে

আরো পড়ুন

লন্ডন বিমানবন্দরে ফ্লাইট মিস করে বিমানের পিছু নিলেন বাংলাদেশি নারীঃ কাচে আঘাত করে ফেরানোর চেষ্টা

নিউজ ডেস্ক

খেলা দেখতে ভারতে আসছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক

নিউজ ডেস্ক

এবার এমপি পদ থেকেও টিউলিপের পদত্যাগ দাবি, পিটিশন দাখিল