যুক্তরাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণভোটের দাবি জোরালো করতে একজোট হচ্ছে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে তিন দেশের শীর্ষ নেতারা বৈঠকে বসে একটি সমঝোতা স্মারক ও যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করার কথা রয়েছে।
কার্ডিফ বে’র সেন্ট ডেভিডস হোটেলে অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টাররা অংশ নেবেন। বৈঠকে যুক্তরাজ্য থেকে পৃথক হওয়ার বিষয়ে গণভোট আয়োজনের দাবি এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
সম্মেলনে আয়ারল্যান্ডের বিরোধীদলীয় নেতা ও সিন ফেইনের প্রেসিডেন্ট মেরি লু ম্যাকডোনাল্ডও অংশ নেবেন। যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার দাবিকে সামনে রেখে তিন দেশের নেতাদের এই সমন্বিত উদ্যোগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার ও স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির নেতা জন সুইনি দীর্ঘদিন ধরে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সংসদ সদস্যদের বলেছেন, স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা নিয়ে স্পষ্ট জনমত তৈরি হলে তিনি আরেকটি গণভোটের অনুমোদন দিতে পারেন।
বার্নহ্যামের এই বক্তব্যের পরই স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের নেতাদের মধ্যে সমন্বিত তৎপরতা আরও জোরালো হয়েছে। জন সুইনি দাবি করেছেন, স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটের বাস্তবতা প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামকেও শেষ পর্যন্ত মেনে নিতে হচ্ছে। তার দাবি, বার্নহ্যাম যুক্তরাজ্যের ‘সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে ইতিহাসে পরিচিত হতে পারেন।
ওয়েলসেও স্বাধীনতার দাবি রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। ওয়েলস পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে স্বাধীনতাপন্থি প্লাইড কামরি। দলটির নেতা রুন আপ ইওরথ বর্তমানে ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্কটল্যান্ডে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও স্বাধীনতাপন্থি এসএনপি তাদের অবস্থান ধরে রেখেছে। গ্রিন পার্টি ও রিফর্ম পার্টি কিছু আসন বাড়ালেও স্কটিশ পার্লামেন্টে এসএনপি ছয়টি আসন হারিয়েছে।
উত্তর আয়ারল্যান্ডেও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। ২০২২ সালের স্টরমন্ট নির্বাচনে সিন ফেইন জয়ী হওয়ার পর দলটির মিশেল ও’নিল ফার্স্ট মিনিস্টার হওয়ার অবস্থানে আসেন। তবে ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির বয়কটের কারণে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তার দায়িত্ব গ্রহণ বিলম্বিত হয়।
আগামী বছরের নির্বাচনে উত্তর আয়ারল্যান্ডে সিন ফেইনের অবস্থান ধরে রাখার সম্ভাবনাও রাজনৈতিকভাবে আলোচনায় রয়েছে। একই সময়ে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের প্রশ্নটি নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ডাবলিন সফরের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ডের পক্ষে ইতিবাচক মন্তব্য করেন। আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে উত্তর আয়ারল্যান্ড যুক্ত হলে সেটিকে ‘চমৎকার’ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে খারাপের কী আছে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণকে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যেই স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের নেতাদের সমন্বিত উদ্যোগ কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
সোমবারের কার্ডিফ সম্মেলনে তিন ফার্স্ট মিনিস্টারের পাশাপাশি মেরি লু ম্যাকডোনাল্ডের অংশগ্রহণও আলোচনাকে আরও বিস্তৃত করবে। বৈঠকে যুক্তরাজ্যের বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো, স্বাধীনতার গণভোটের দাবি এবং তিন অঞ্চলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে যৌথ অবস্থান নির্ধারণের চেষ্টা হবে।
তিন দেশের নেতাদের প্রস্তাবিত যৌথ ঘোষণাপত্র ও সমঝোতা স্মারক যুক্তরাজ্যের অখণ্ডতা এবং ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। তবে স্বাধীনতার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে গণভোট এবং পরবর্তী সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন হবে।
সূত্রঃ দ্য টেলিগ্রাফ \ দ্য গার্ডিয়ান
এম.কে

