TV3 BANGLA
আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র থেকে লন্ডনে ৮৬ টন সোনা সরাল নেদারল্যান্ডসঃ ট্রাম্পকে ঘিরে ইউরোপের উদ্বেগ বাড়ছে

ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সংরক্ষিত বিপুল পরিমাণ সোনা সরিয়ে নিয়েছে নেদারল্যান্ডস। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডি নেদারল্যান্ডশে ব্যাংক (DNB) জানিয়েছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে প্রায় ৮৬ টন সোনা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এর বড় একটি অংশ লন্ডনে স্থানান্তর করা হয়েছে। ব্যাংকটির দাবি, কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান থেকে নয়, বরং সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি বাড়ানো এবং সোনার রিজার্ভকে আরও সহজে ব্যবহারযোগ্য করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ।

নেদারল্যান্ডসের কাছে বর্তমানে প্রায় ৬১২.৪ টন সোনা রয়েছে। এর আনুমানিক মূল্য ৮৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সাম্প্রতিক স্থানান্তরের আগে দেশটির মোট সোনার ৩১.৩ শতাংশ নিউইয়র্কে, ১৯.৭ শতাংশ কানাডার অটোয়ায়, ৩০.৮ শতাংশ নেদারল্যান্ডসের জেইস্টে এবং ১৮.১ শতাংশ লন্ডনে সংরক্ষিত ছিল। নতুন ব্যবস্থার পর লন্ডনে থাকা সোনার অংশ বেড়ে ৩২.১ শতাংশ হয়েছে। বিপরীতে নিউইয়র্ক ও অটোয়ায় থাকা অংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৮.৫ শতাংশ করে। নেদারল্যান্ডসের নিজস্ব ভল্টে থাকা অংশ অপরিবর্তিত রয়েছে।

তবে পুরো ৮৬ টন সোনা শারীরিকভাবে উত্তর আমেরিকা থেকে লন্ডনে নেওয়া হয়নি। DNB জানিয়েছে, প্রায় ৫৯ টন সোনা নিউইয়র্কে বিক্রি করে লন্ডনে সমপরিমাণ সোনা কেনা হয়েছে। আরও প্রায় ২৭ টন সোনা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে নেদারল্যান্ডসের জেইস্টে স্থানান্তর করা হয় এবং একই পরিমাণ সোনা জেইস্ট থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়। এর ফলে উত্তর আমেরিকায় থাকা সোনার বারগুলো গলিয়ে নতুন করে তৈরি করার প্রয়োজন হয়নি এবং লন্ডনের আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত লেনদেনের উপযোগী সোনা পাওয়া গেছে।

DNB-এর প্রেসিডেন্ট ওলাফ স্লেইপেন বলেছেন, এই পুনর্বিন্যাসের ফলে নেদারল্যান্ডসের সোনার রিজার্ভের ‘ট্রেডেবিলিটি’ বা লেনদেনযোগ্যতা বাড়বে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দেশটি আশা করে কখনোই এই রিজার্ভকে বড় সংকটের সময় ব্যবহার করতে হবে না। তবে সম্ভাব্য সংকটের জন্য আগে থেকেই স্থিতিস্থাপকতা ও প্রস্তুতি বাড়ানো প্রয়োজন।

লন্ডনে সোনা সরিয়ে নেওয়ার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো দ্রুত লেনদেনের সক্ষমতা। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে সংরক্ষিত সোনার বারগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের প্রচলিত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় প্রয়োজনের সময় এগুলো তুলনামূলক দ্রুত বাজারে ব্যবহার করা যায়। DNB-এর মতে, নিউইয়র্ক ও অটোয়ায় রাখা সোনা একই পরিস্থিতিতে ‘যত দ্রুত ও সরাসরি’ ব্যবহার করা সম্ভব নয়।

নেদারল্যান্ডসের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক নানা ইস্যুতে চাপের মুখে রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি, ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি ওয়াশিংটনের অবস্থান এবং ইরান যুদ্ধকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে মতপার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যেও তীব্র বাণিজ্য বিরোধ তৈরি হয়েছে, যা কানাডায় রাখা নেদারল্যান্ডসের সোনার বিষয়টিকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

ইরান যুদ্ধকে ঘিরে ইউরোপের কয়েকটি দেশ ওয়াশিংটনের প্রত্যাশিত সহযোগিতা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফ্রান্স ইসরায়েলি অস্ত্রবাহী বিমানকে তার আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। ইতালি মার্কিন বোমারু বিমানকে সিসিলিতে অবতরণের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। স্পেনও ইরান যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে তার ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রকে তার ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিলেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার পার্লামেন্টে জানান, ব্রিটেন সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেবে না।

এর মধ্যেই ট্রাম্প ও ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের সময় ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি ট্রাম্পের কঠোর মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তোলে। ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ওয়াশিংটনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা এবং বিদেশে জাতীয় সম্পদ সংরক্ষণের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।

তবে নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তাদের সিদ্ধান্তকে যুক্তরাষ্ট্রে রাখা সোনা জব্দ হওয়ার আশঙ্কা বা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা উচিত নয়। ব্যাংকের প্রকাশ্য অবস্থান হলো—সোনার রিজার্ভ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রাখা হলে কোনো একটি দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনি পরিস্থিতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানো যায়। পাশাপাশি সংকটের সময় সোনা দ্রুত ব্যবহার করার সক্ষমতাও বাড়ে।

বিদেশে জাতীয় রিজার্ভ রাখার ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে আলোচনার একটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন চালানোর পর পশ্চিমা দেশগুলোর রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ জব্দের ঘটনা। ওই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, কোনো দেশের গুরুত্বপূর্ণ রিজার্ভ বিদেশি ভূখণ্ডে রাখা হলে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক সংকটের সময় তা অন্য দেশের সিদ্ধান্ত বা নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে কি না।

এই পরিস্থিতিতে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, জাতীয় সোনার রিজার্ভ কোথায় রাখা হবে—এটি এখন কেবল আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও জড়িয়ে গেছে। বিদেশে রাখা সোনার ওপর সরাসরি শারীরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিষয়টি তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

নেদারল্যান্ডস অবশ্য এই প্রবণতায় একা নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে রাখা ১২৯ টন সোনা স্থানান্তর করে। ফ্রান্সও এই সিদ্ধান্তের পেছনে সরাসরি রাজনৈতিক কারণ থাকার কথা অস্বীকার করেছে এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সোনার ব্যবস্থাপনা থেকে আরও ভালো রিটার্ন পাওয়ার বিষয়টি সামনে এনেছে।

জার্মানিও অতীতে বিদেশে রাখা বিপুল পরিমাণ সোনা দেশে ফিরিয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে দেশটি নিউইয়র্ক থেকে প্রায় ৩০০ টন এবং প্যারিস থেকে প্রায় ৩৭৪ টন সোনা ফ্রাঙ্কফুর্টে ফিরিয়ে নেয়। তবে জার্মানির এখনও প্রায় ৩,৩৫০ টন সোনার রিজার্ভের মধ্যে প্রায় ১,২৩৬ টন বা ৩৬.৬ শতাংশ নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে সংরক্ষিত রয়েছে।

জার্মানির কিছু রাজনীতিবিদ ট্রাম্পের অনির্দেশ্য রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে এত বিপুল পরিমাণ সোনা রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে জার্মান কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ধরনের উদ্বেগ প্রত্যাখ্যান করেছে। বুন্দেসব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ইয়োয়াখিম নাগেল জানিয়েছেন, নিউইয়র্কে সংরক্ষিত জার্মান সোনা নিরাপদ রয়েছে এবং এসব রিজার্ভের জন্য বিশেষ আইনি সুরক্ষাও রয়েছে।

এর বাইরেও কয়েকটি দেশ নিজেদের সোনার রিজার্ভ কোথায় রাখা হবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে। ২০১৮ সালে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রে রাখা তার সোনার রিজার্ভ প্রত্যাহার করেছিল বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ইতালির ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বিপুল পরিমাণ সোনা নিয়ে আলোচনা চলছে। ভারতেরও বিদেশের বিভিন্ন ভল্টে সোনা সংরক্ষিত রয়েছে।

তবে নেদারল্যান্ডসের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপের সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। লন্ডনও যুক্তরাষ্ট্রের মতোই বিশ্বের অন্যতম প্রধান সোনা বাণিজ্যকেন্দ্র এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে সোনা রাখা আন্তর্জাতিক বাজারব্যবস্থারই অংশ। নেদারল্যান্ডসের ক্ষেত্রে মূল পরিবর্তন হলো, উত্তর আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে লন্ডনে রিজার্ভের অংশ বাড়ানো।

তারপরও ফ্রান্সের ১২৯ টন এবং নেদারল্যান্ডসের ৮৬ টন সোনা পুনর্বিন্যাস ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তিত চিন্তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও কোনো ইউরোপীয় দেশ একই ধরনের পদক্ষেপ নেয় কি না, সেটিই এখন নজর রাখার বিষয়।

সূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান \ এএফপি

এম.কে

আরো পড়ুন

যুদ্ধবিরতিতে রাজি ইরান-ইসরায়েলঃ ট্রাম্প

ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্থগিতে কেন চাপের মুখে ইইউ

ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতকে তলব যুক্তরাজ্যের, কিন্তু কেন?